08/06/2015
নেপালে ভুমিকম্প বিপর্যস্ত গ্রামে গিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা...
গত ৩১শে মে কলকাতা স্টেশন থেকে Friends of west Bengal in Solidarity with Nepal এর পক্ষ থেকে আমরা রওনা দিয়েছিলাম নেপালের উদ্দেশ্যে। শিলিগুড়ি জং হয়ে আমরা ১লা জুন পৌছালাম পানিট্যাঙ্কিতে (ভারত-নেপাল সীমান্ত)। ভারতের কাস্টমস নিয়ম মাফিক চেকিং ও ছাড়পত্র পেয়ে আমরা দুপুর ২টো ১০মিনিটে নেপালে প্রবেশ করলাম। কলকাতা থেকে আমারা ৮জন (অজয় বক্সী, দেবব্রত শিকদার, শিল্পক মুখার্জি, মধুমন্তী ঘোষ, সৌরিশ মিত্র, অভীক মুখার্জি, আবু সোলাইমান দারানি ও ডাঃ কুশল সেন) এবং দার্জিলিং থেকে লালি গুরাশ পত্রিকার ৬জন (গুঞ্জন রানা, কপিল তামাং, নুমা সুব্বা, শৈলেন্দ্র, সুমিত ও ধুনী ) এছাড়াও আমাদের সাথে নেপাল সীমান্ত পর্যন্ত ছিল অরিজিৎ দা ও শমীক দা।
নেপালের কাস্টমসের চেকিং সেরে আমরা কাঁকারভিটা বাসস্ট্যান্ডে পৌছালাম। সাথে আমাদের ত্রান সামগ্রী। ওখানে ভূপাল রাজ শ্রেষ্ঠা (নেপালের যে গ্রামে আমরা যাচ্ছি সেখানকার স্থানীয়) আমাদের যাতায়াতের পরবর্তী পরিকল্পনা কি হবে তা জানাল। সেই মত আমরা এগোলাম। বিকেল ৫টা ৩০মিনিটে কাঁকারভিটা থেকে বাস রওনা দিল। প্রায় ১৩ ঘন্টার বাস জাত্রার পর আমরা পরদিন অর্থাৎ ২ জুন সকাল ৮টায় পৌছালাম ম্যান্থলিতে। এখান থেকে রামেছাপ (যে গ্রামে আমরা যাব) –এর বাস ছাড়বে দুপুর ১টায়। আমরা অপেক্ষা না করে হাঁটা পথে এগোতে থাকলাম। পাহাড়ি পথে হাঁটা! ট্র্যেক! ২২ কিমি পথ হেঁটে ৮ ঘন্টা পর আমরা পৌছালাম হিলেপানি, পালবন; রামেছাপে।
এখানে আমরা যে যে কাজ আগামী কয়েকদিন করব তার একটা খসড়া তৈরি হল। ঠিক হয় পরদিন অর্থাৎ ৩ জুন থেকে কাজ শুরু হবে। দীর্ঘ ৪৮ ঘণ্টার জাত্রার ধকল নিয়ে আমরা প্রায় প্রত্যেকেই বিদ্ধস্ত। রাতের খাওয়া সেরে আমরা টেন্টে থাকলাম। আঙুর গাছের তলায় টেন্ট খাটিয়ে থাকার একটা আলাদা অনুভূতি!
৩ তারিখ সকাল থেকে পুরদমে কাজ শুরু হয়ে গেল। একদিকে ড. কুশল সেনের তত্বাবধনে মেডিক্যাল ক্যাম্প আর নুমা, গুঞ্জন, মধুমন্তি রা ড্রায় ফুড পরিবারের হাতে তুলে দিতে প্যাকেট (চাল, ডাল, নুন, আটা, সুজি, চিনি, ছাতু, বিস্কুট) করতে শুরু করে দেয়। বাকিরা চলে যায় স্কুলের কাজে। শ্রী গৌরিশঙ্কর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। স্কুলের একটা স্থায়ী ব্লক আমরা তৈরি করব ঠিক হয়। প্রথমে মাপযোগের কাজ সেরে শুরু হয় ভিত খোড়া। প্রত্যকে হাত লাগালাম। দিনের আলো যতক্ষণ থাকল ততক্ষণ কাজ চলল। ওদিকে সারাদিনে ১৭৫ জনের মত মেডিক্যাল চেকআপ ও ৪৮জন পরিবারের হাতে ত্রান সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।
এই গ্রামে মাটির তৈরি অনেকগুলি বাড়ি সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। আর পাথর-মাটি মিশিয়ে তৈরি প্রায় সব বাড়িতেই ফাটল ধরেছে। ফলে মানুষজন ত্রিপল খাটিয়ে অস্থায়ি ছাওনির তলায় দিন গুজরাচ্ছে। তবে যে কয়েকটা বাড়ি নতুন করে অর্থার বছর কয়েকের মধ্যে তৈরি হয়েছে সেগুলোর কোন ক্ষতি হয়নি। সিন্ধুপালচক-কারে ও গোর্খা (আমাদের আগের টিম যেখানে গিয়েছিল) তে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যতটা বেশি এখানে ততটা নয়। তবে বেশীরভাগ বাড়িতে আর থাকা জাচ্ছে না। ফলে মানুষদের ঠিকানা এখন রাস্তার পাশে, মাঠে বা অন্য কথাও।
আমরা স্কুলকে মোট চার লক্ষ (নেপালি টাকা) দিয়েছি নতুন স্থায়ী ব্লক তৈরির জন্য। এই কয়দিন যতটুকু কাজ হল তার অর থেকে কাজ চলতে থাকবে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে কাজ সম্পূর্ণ হলে আমাদের এই টিমের ১/২ জন আসবে-এই ঠিক হয়েছে। এবং আমরা আগামী দিনে এই গ্রামের মানুশদের পাশে দাঁড়াতে ও সাহায্যর হাত বাড়িয়ে দেব এই লক্ষই রইল আমাদের।
৫ জুন আমাদের টিম কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। রামেছাপ বাজার থেকে বাস ধরে খুরকুট-বারদিবাস-কাঁকরভিটা-পানিট্যঙ্কি হয়ে আমরা নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌছালাম এবং পাহাড়ি একপ্রেস ধরে হাওড়া পৌছালাম ৬ জুন সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে।
এই কয়েকদিনে নেপালে ভূকম্প পীড়িত মানুষদের কাছে গিয়ে নিজেদের চোখে অনেক কিছুই দেখলাম। এখানকার মিডিয়াগুলোর হেডলাইনের তলায় অনেক কিছুই যে চাপা পড়ে যায় তা কিন্তু হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেল। প্রথম দিকে যে সামান্য ত্রানকার্জ করেছে সরকার ও অনান্য বিশাল বড় এন.জি.ও তা মুলত শহর, কাটমান্ডু কেন্দ্রিক। গ্রামগুলো যে বঞ্চিত থেকে যায় তা দেখলাম। নেপালের মানুষগুলো প্রাথমিক ট্রমা কাটিয়ে সেরে উঠতে চাইছে। তাদের এই লড়ায়েই পাশে দাঁড়াতে ও সাথ দিতে পারাটা আমাদের কাছে অনেক....কি জানি এই ভাবেই হয়ত বাঁচার রসদ খুঁজে পাব আগামী দিনে!