16/04/2025
ড. বি আর আম্বেদকর : নিম্নবর্ণের অস্পৃশ্য ছেলেটির বেড়ে ওঠার গল্প।
বোম্বের এলফিনস্টন হাই স্কুল, শিক্ষক পড়াচ্ছেন ক্লাসে। উদাহরণের একটি সমস্যা সমাধানের জন্য ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসা একজন ছাত্রকে ডাকলেন তিনি। ভীমরাও নামের ছাত্রটি উঠে আসছিলো ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে যেন পুরো ক্লাসে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল। অন্যান্য ছাত্ররা তাদের টিফিন বক্স রাখতো ব্ল্যাকবোর্ডের পেছনে। ভীমরাও ব্ল্যাকবোর্ডের কাছে আসার আগেই সবাই তাড়াহুড়ো করে নিজেদের টিফিন বক্স সরাতে লাগলো। কারণ ভীমরাও কাছাকাছি আসলে যে, তাদের খাবার অপবিত্র হয়ে যাবে।
কী প্রচণ্ড ঘৃণা! কেন? কারণ ভীমরাও যে জন্মেছেন নিন্মবর্ণের পরিবারে। মহর পরিবারে জন্ম নেয়া একজন দলিত তিনি। যে জাতিকে তৎকালীন ভারতের অস্পৃশ্য হিসাবে মানা হত। তার কাছাকাছি আসলে কি খাবারের পবিত্রতা থাকবে? উচ্চবর্ণের মানুষদের তার সাথে মেশা শোভা পায়? ভীমরাওয়ের জন্য অবশ্য এসব নতুন কিছু না। সেই ছোটবেলা থেকে সয়ে আসছেন তিনি। বোম্বের এই স্কুলে তো তা-ও ক্লাসের বেঞ্চে বসার জায়গা মিলেছে। হোক না তা এককোণে। একদম শেষের সারির বেঞ্চে।
অনেক ধর্না দেয়ার পর দাপোলিতে তিনি প্রথম স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তখন গোটা স্কুলে তারা কেবল ছয়জন দলিত ছিলেন। তাদের জন্য আলাদা একটি কক্ষের বন্দোবস্ত ছিল। হিন্দু শিক্ষকরা সেই কক্ষে কখনো প্রবেশ করতেন না। দরজার বাইরে থেকে মাঝেমধ্যে খোঁজ খবর নিয়ে যেতেন। শিক্ষকদের কোনো প্রশ্ন করার অধিকার ছিলো না তাদের। কোনো কিছু না বুঝলেও চলে আসতে হতো সেভাবেই। সেই ছয়জন থেকে ভীমরাও একাই প্রাথমিক স্কুলের বেশী পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
পরবর্তীতে তার পরিবার দাপোলি থেকে সাতারে চলে আসে। এখানে অবশ্য তিনি ক্লাসের ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু বেঞ্চিতে বসতে পারতেন না। ক্লাসের এক কোনে নিজের নিয়ে আসা পাটের বস্তাটি বিছিয়ে বসে পড়তেন। দিনশেষে আবার সেটি নিয়ে যেতেন সঙ্গে করে। কারণ স্কুল পরিষ্কার করা কর্মচারীও সেটি স্পর্শ করতেন না।
স্কুলের ট্যাপ খুলে বা মগ থেকে তার জল খাবার অনুমতি ছিলো না। কারণ তার ছোঁয়ায় এসব অপবিত্র হয়ে যাবে। কেবল যখন উচ্চ বর্ণের কেউ ট্যাপ খুলে দিত বা মগ থেকে জল ফেলে দিত, তখনই তার তৃষ্ণা মেটাবার সুযোগ মিলত। এ ‘নিচু’ কাজটার দায়ভার সাধারণত স্কুলের পিয়নের কাঁধেই পড়তো। সে গ থেকে জগ ঢালত ভীমরাওয়ের জন্য। অন্য কেউতো কাছেই ঘেঁষতো না তেমন। যেদিন পিয়ন থাকতো না, সেদিন তাকে তৃষ্ণার্ত হয়েই কাটাতে হতো।
এতক্ষণ যার কথা বলেছি তার পুরো নাম ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। দলিতরা যাকে ভালোবেসে ‘বাবা সাহেব’ বলে ডাকেন। পরবর্তীকালে যিনি হয়ে উঠেছিলেন তুখোড় অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক। তিনি হয়েছিলেন ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী, ভারতীয় সংবিধানের মুখ্য স্থপতি। তবে সবচেয়ে আগে তার যে পরিচয়টি দেয়া দরকার তা হলো, বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ১৯৯০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক উপাধি ‘ভারতরত্ন’-তে ভূষিত করা হয় তাঁকে।
বি আর আম্বেদকর জন্মেছিলেন ১৮৯১ সালে, ১৪ এপ্রিল। বর্তমান ভারতের মধ্যপ্রদেশের মোহ অঞ্চলে। রামজি মালোজি শাকপাল ও ভীমাবাই এর চতুর্দশ সন্তান ছিলেন তিনি। তার পূর্বপুরুষদের অধিকাংশই ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তার পিতা রামজি সকপাল একজন সুবেদার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। মূলত পিতার ইচ্ছাতেই তার স্কুলের পাঠ শুরু হয়। সেখানে দলিত হওয়ার কারণে তিনি শৈশবেই যে তীব্র বিদ্ধেষের মুখোমুখি হয়েছেন তা উপরের ঘটনাগুলো থেকে কিছুটা টের পাওয়া যায়। আম্বেদকরের আসল পদবি ছিল 'সকপাল', তাঁর পিতা সেটি পাল্টে রাখেন 'আম্বাদাভেকর', যার অর্থ হল তিনি তাঁর গ্রাম 'আম্বাদাভে' থেকে এসেছেন। পরবর্তীকালে তাঁর ব্রাহ্মণ স্কুল শিক্ষক কৃষ্ণ কেশব আম্বেদকর তাঁর পদবি পরিবর্তন করে নিজের পদবি তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে দেন। পিতার উৎসাহে ছোট থেকেই তিনি পড়াশোনায় যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন। ছোট থেকেই তিনি তাঁর সন্তানদের হিন্দু সংস্কৃতি পড়তে উদ্বুদ্ধ করতেন।
আম্বেদকর প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতি থেকে মারাঠি এবং ইংরেজিতে ডিগ্রী লাভ করেছিলেন। তবে দলিত হওয়ার কারণে শৈশবে প্রাথমিক স্কুল থেকেই তাঁকে তীব্র জাতিবিদ্বেষের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেক ধর্না দেওয়ার পর দাপোলিতে তিনি প্রথম স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর পরিবার দাপোলি থেকে সাতারে চলে আসে। সাতারে আসার অল্পদিনের মধ্যেই আম্বেদকরের মা মারা যান। এরপর মাসির কাছে কষ্টকর পরিবেশে বড় হয়ে ওঠেন আম্বেদকর।
তবে এ বিদ্ধেষ যে শুধু স্কুলেই সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়। স্কুলের বাইরেও এ হেনস্থা তার পিছু ছাড়েনি। একবারের একটি ঘটনা তার মনে ভীষণ দাগ কেটে যায়। তার বয়স তখন নয়-দশ বছরের মতো। তারা ভাই-বোনরা মিলে সতর থেকে তার পিতার কর্মস্থল কোরগাঁও বেড়াতে যাচ্ছিলেন। সেদিন রেলস্টেশন থেকে তাকে তার বাবার এসে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তিনি তাদের যাওয়ার খবর পাননি।
রেলস্টেশন এসে ভীমরাওরা বেশ বিপাকে পড়লেন। তারা বাচ্চা কয়েকটি ছেলেমেয়ে, বড়সড় সব ব্যাগ সাথে, তার ওপর এখানে কিছুই চেনেন না তারা। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও কেউ এলো না। স্টেশন মাস্টার এগিয়ে আসলেন কী হয়েছে জানতে। তারা সব বৃত্তান্ত বললেন তাকে। তিনি সব দেখেশুনে বেশ আগ্রহের সাথে তাদের সাহায্য করতে চাইলেন। তাদের নতুন জামাকাপড় দেখে তিনি তাদের ব্রাহ্মণসন্তানই ভেবেছিলেন। একসময় তিনি কথায় কথায় তাদের পরিচয় জানতে চাইলেন। তারা দ্বিতীয়বার না ভেবেই বলে দিলেন যে, তারা 'মহর' গোত্রের।
তারা দলিত শুনে স্টেশন মাস্টার যেন বড়সড় ধাক্কা খেলেন। তিনি পিছু হটে নিজের কামরায় চলে গেলেন। অবশ্য আধাঘন্টা পর ফের এলেন। চেষ্টা করলেন তাদের একটি গাড়িতে উঠিয়ে দিতে। কিন্তু কোনো গাড়ির চালক তাদের গাড়িতে উঠতে দিতে চায়নি। কারণ দলিতদের সাথে একই গাড়িতে চালক বসবেন কীভাবে? তাছাড়া গাড়িও অপবিত্র হয়ে যাবে। অবশেষে ভীমরাও নিজে সেদিন গাড়ি চালিয়েছিলেন, পাশে চালক হেঁটে গিয়েছেন। আর তাকে ভাড়াও দিতে হয়েছে দ্বিগুণ।
সে রাতে তাদের সাথে যথেষ্ট খাবার থাকা সত্ত্বেও তাদের অভুক্ত থাকতে হয়েছিল। কারণ তারা পানি জোটাতে পারেন নি। অস্পৃশ্যকে জল দেবে কে? এসব তো কেবল খন্ডচিত্র। তারা যে পাড়ায় থাকতেন যেখানে অধিকাংশই উচ্চবর্ণের হিন্দু ছিল। সেখানে কোনো নাপিত তাদের চুল কেটে দিতো না, কোনো ধোপা তাদের কাপড় কেঁচে দিতো না। তার বড় বোনকেই তার ও তার ভাইদের চুল কেটে দিতে হতো।
আর এ বৈষম্য যে শুধু উচ্চবর্ণের হিন্দুরাই করতো তা নয়। তার স্মৃতিকথা থেকে এর একটি প্রমাণ পাওয়া যায়। তার যুবক বয়সের কথা। একবার তারা কয়েকজন দলিত আওরঙ্গবাদ হয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের যাত্রাপথেই পড়ছিল বিখ্যাত দৌলতাবাদ শহর। এখান দিয়ে যাওয়ার সময় কোনো পর্যটক ঐতিহাসিক দৌলতাবাদ দুর্গে না ঘুরে যান না। আম্বেদকর ও তার সঙ্গীরাও দৌলতাবাদ দুর্গ ঘুরে যাবেন বলে ঠিক করলেন।
সে এলাকাটি ছিল মুসলিমপ্রধান এলাকা। আর তখন মুসলমানদের পবিত্র রমজান মাস। দৌলতদিয়া দুর্গের সামনে পানিতে পরিপূর্ণ একটি কূপ ছিল। যেখানে মুসলমানরা অজু করতেন। আম্বেদকররা যখন সেখানে গেলেন তখন ধুলাবালিতে তাদের সারা শরীর আচ্ছন্ন হয়ে আছে। তারা কূপের পানি দিয়ে হাত মূখ ধুয়ে নিলেন। তারপর এগিয়ে গেলেন দুর্গের দিকে। হঠাত পেছন থেকে একজন বৃদ্ধ মুসলমান বলে উঠলেন, “এই অচ্ছুতেরা কূপের জলকে অপবিত্র করে দিয়েছে।”
তার কথা শেষ হওয়ার পর আরো কয়েকজন চেঁচিয়ে উঠলেন, “অচ্ছুতের বড় বাড় বেড়েছে, এদের একটা শিক্ষা দেয়া উচিৎ” মুহূর্তের মধ্যে যেন পুরো লড়াই বাঁধার উপক্রম। অবস্থা গুরুতর দেখে আম্বেদকররা সহ বোঝাতে লাগলেন যে, তারা বাইরে থেকে এসেছেন। এখানের স্থানীয় রীতিনীতি সম্পর্কে তাদের জানা নেই। কিন্তু মুসলিমরা থামছিলেন না। তারা ওখানের স্থানীয় দলিতদের ওপর চড়াও হলেন, তারা কেন এদের জানায় নি। আম্বেদকর দেখলেন যে, এভাবে চলতে থাকলে দাঙ্গা বাঁধাও অসম্ভব নয়।
তিনি মুসলমানদের বোঝাতে লাগলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। পেছন থেকে এক তরুণ মুসলিম বলে উঠলেন, “সবার নিজেদের ধর্ম মেনে চলা উচিৎ। নিজেদের সীমার মধ্যে থাকা উচিৎ।” এ কথা শুনে আম্বেদকর আর রাগ ধরে রাখতে পারলেন না। ক্ষিপ্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার ধর্ম কী তোমাকে এই শিক্ষা দেয়? যদি এই অস্পৃশ্যরা মুসলমান হয়ে যায়, তবেও কী তুমি তাদের এই কূপের জল স্পর্শ করা থেকে বাঁধা দেবে?” তার প্রশ্নগুলো শুনে উপস্থিত মুসলমানরা যেন কিছুটা থমকে গেল।
সেদিন তিনি বুঝেছিলেন, কেবল উচ্চবর্ণের হিন্দুদের কাছেই তারা অস্পৃশ্য বা ঘৃণিত নন। ভারতের একটা বড় মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছেও তারা ঘৃণিত। তিনি তার জীবনের প্রতিটি পদে পদে দেখেছেন কীভাবে এক অদ্ভুত প্রথার কারণে তীব্র ঘৃণার বান ছুঁড়ে দেয়া হচ্ছে এক বিশাল জনগোষ্ঠীর দিকে। কীভাবে টেনে হিঁচড়ে সমাজের নিচু স্তরে দমিয়ে রাখা হচ্ছে তাদের। এসব ঘটনা তীব্রভাবে আহত করে তাকে। সমাজের কাঠামো নিয়ে প্রচন্ড হতাশ হয়ে পড়েন তিনি।
তীব্র হতাশা থেকেই জন্ম হয় সমাজ সংস্কারকদের, বিপ্লবীদের। কেননা এ হতাশাই এনে দেয় সমাজ বদলানোর জেদ। যা বি আর আম্বেদকরের মনেও তীব্রভাবে জেগেছিল। তিনি তার জীবনের মিশন হিসেবে নিয়েছিলেন বর্ণবৈষম্য দূরীকরণকে। দলিতদের মুখপাত্র হয়ে উঠেছিলেন গোটা ভারতে। তাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এক সুন্দর ভবিষ্যতের। আর এসব কারণেই তিনি দলিতদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন ভালোবাসার ‘বাবা সাহেব’।
আম্বেদকর তাঁদের জাতি ‘মহর’ থেকে প্রথম মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করতে সক্ষম হন। ১৯১২ সালে তিনি বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানে ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর তিনি বরোদায় সরকারি চাকরি গ্রহণ করেন। ১৯১৩ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি আমেরিকার নিউইয়র্ক এর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ছাত্র হিসেবে যোগ দেন। তিনি এই পড়াশোনার জন্য বরোদা সরকারের বৃত্তি পান। ১৯১৫ সালে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স-এ ১৯১৬ সালে ভর্তি হন তবে ১৯১৭ সালের জুন মাসে বরোদা বৃত্তি শেষ হয়ে গেলে তিনি ভারতে ফিরে যেতে বাধ্য হন । ১৯২১ সালে তিনি আবার লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স-এ ফিরে যাওয়ার সুযোগ পান এবং সেখানে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রী পান, ১৯২৩ সালে ডি.এসসি. ডিগ্রী লাভ করেন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯২৭ সালে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন।
আইন চর্চার শুরুর দিকে আম্বেদকর কিছু ব্রাহ্মণ এবং অব্রাহ্মণ নেতাদের অভ্যন্তরীণ মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়েন। ১৯২৬ সালের অক্টোবর মাসে তিনি বিজয়ী হন। বোম্বে হাইকোর্টের আইনজীবী থাকাকালীন আম্বেদকর অস্পৃশ্যদের শিক্ষিত করে তুলতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। ১৯২৭ সালে তিনি অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি গণ আন্দোলন শুরু করেন এবং ‘সুপেয় জল পানের অধিকার’ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলনের জন্য ১৯৩২ সালে লন্ডনে দ্বিতীয় গোল টেবিল বৈঠকে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকারের তাঁর সাথে একমত হন এবং পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী ঘোষণা করেন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধী ও তাঁর অনুগামীদের প্রবল চাপের মুখে আম্বেদকর পৃথক নির্বাচন মণ্ডলী বাতিল করতে বাধ্য হন। ইতিহাসে এটি ‘পুনেচুক্তি’ নামে পরিচিত। এর ফলে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন অস্পৃশ্যদের জন্য সংরক্ষিত হয়। এই চুক্তিতে যাকে বলা হয় ‘অস্পৃশ্য সম্প্রদায়’।১৯৩৫ সালে তিনি মুম্বাইয়ের সরকারি আইন মহাবিদ্যালয় এর অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হন। এসময় তিনি একটি ব্যক্তিগত পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। এই একই বছরে তাঁর প্রথম স্ত্রী রামাবাই মারা যান। ১৯৩৬ সালে আম্বেদকর স্বনির্ভর শ্রমিকদল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৭ সালে তাঁর বই ‘দ্য অ্যানিহিলেশন অফ কাস্ট’ প্রকাশ করেন। তিনি অস্পৃশ্য ও বর্ণ প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন।
রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যোগ দেওয়ার আগে তিনি পুরোদস্তুর অর্থনীতিবিদ ছিলেন এবং বেশ কিছু বইও রচনা করেছিলেন। 'ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক' বা 'আরবিআই'-এর রূপরেখা ও নীতি নির্দেশিকা 'হিল্টন ইয়ং কমিশনে' তাঁর দেওয়া প্রস্তাবনা থেকেই তৈরি হয়।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে এবং নতুন সরকারের প্রথম আইন মন্ত্রী হন আম্বেদকর। ২৯ শে আগস্ট আম্বেদকরকে সংবিধান খসড়া সমিতির সভাপতি করা হয় ১৯৪৯ সালের ২৬শে নভেম্বর গণপরিষদ করতে সংবিধান গৃহীত হয়। তিনি আর্টিকেল ৩৭০ এর বিরোধিতা করেছিলেন এবং ইউনিফর্ম সিভিল অ্যাক্ট প্রচলনের পক্ষপাতী ছিলেন। ১৯৫১ সালে তাঁর প্রস্তাবিত ‘হিন্দু কোড বিল’ খসড়াটি সংসদে স্থগিত রাখার কারণে তিনি মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। এই বিলটিতে পৈতৃক সম্পত্তি ও বিবাহ আইনের আওতায় লিঙ্গসমতার প্রস্তাব করা হয়েছিল। ১৯৫২ সালের লোকসভা নির্বাচনে নির্দলপ্রার্থী হিসেবে লড়াই করেন ও পরাজিত হন। পরে তিনি ১৯৫২ সালের মার্চ মাসে রাজ্যসভার উচ্চপদস্থ সাংসদ নির্বাচিত হন ও আমৃত্যু এইপদে আসীন ছিলেন।
তিনি ১৯৫১ সালে 'ফিনান্স কমিশন অফ ইন্ডিয়া' তৈরি করেন। তিনি ভূমিসংস্কার ও করব্যবস্থার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। তিনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য জন্ম নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দেন। কৃষিকাজ ও শিল্পের উন্নতির জন্য তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বর্ণপ্রথার জন্য শ্রমিকের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির কারণে অর্থনৈতিক উন্নতি ব্যাঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে বলেও তিনিও মনে করতেন।
বৌদ্ধ ধর্ম ও গৌতম বুদ্ধের জীবনী দ্বারা আম্বেদকর বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা তিনি ‘বোধিসত্ত্ব’ উপাধিতে সম্মানিত হয়েছিলেন। নৃতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে আম্বেদকার জেনেছিলেন আসলে ‘মাহার’রা প্রাচীন ভারতীয় বৌদ্ধ। এই ব্যাপারে তিনি তাঁর পান্ডিত্যপূর্ণ বই, ‘Who were the Shudras’ -তে বর্ণনা দেন। তিনি ‘ভারতীয় বৌদ্ধ মহাসভা’ গঠন করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি তাঁর সর্বশেষ বই ‘The Buddha and His Dharma’- এর কাজ শেষ করেন। বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে তিনি অনেকগুলি রচনা ও গ্রন্থ প্রকাশ করেন যা গৌতম বুদ্ধের জীবনী ও তাঁর ধর্মকে বুঝতে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৪ সালে নেপালের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা 'জাগতিক বৌদ্ধ ধর্ম পরিষদে' বাবা সাহেব আম্বেদকরকে 'বোধিসত্ত্ব' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। উল্লেখ্য, আম্বেদকরই প্রথম জীবিত থাকাকালীন 'বোধিসত্ত্ব' উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।
দিনটা ঠিল ১৯৫৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর। সাংবিধানিক সংশোধনী নিয়ে রাজ্যসভায় বিতর্ক চলছিল। বাবা সাহেব রাজ্যপালের ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে অনড় ছিলেন। সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষায়ও তিনি ছিলেন অনড়। এই বিতর্কের সময়, বাবা সাহেব বলেছিলেন, "নিম্নশ্রেণীর মানুষজন সবসময় এটা ভেবে ভয়ে ভয়ে থাকে সংখ্যাগরিষ্ঠরা তাদের ক্ষতি করতে পারে। আমরা বন্ধুরা আমায় বলেছিল বলে সংবিধান তৈরি করেছি আমি। আমি হব আবার সেই প্রথম ব্যক্তি যে এই সংবিধান পোড়াব। এটা কারও জন্য ভালো নয়। সংখ্যাগুরুদের কখনই বলার অধিকার নেই সংখ্যালঘুদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়। তাহলে আসলে গণতন্ত্রের ক্ষতি হবে।" আম্বেদকরের বক্তব্য নিয়ে বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়।
এই বিতর্কের ঠিক দুই বছর পরে, ১৯ মার্চ ১৯৫৫-এ এই বিষয়টি আবার রাজ্যসভায় উত্থাপিত। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী সংক্রান্ত বিল নিয়ে আলোচনা চলছে তখন। পাঞ্জাবের সাংসদ ডঃ অনুপ সিং, যিনি হাউসে আলোচনায় অংশ নিতে এসেছিলেন, তিনি বাবা সাহেবকে প্রশ্ন করেন, কেন তিনি আগেরবার সংবিধান পোড়ানোর কথা বলেছিলেন। সে প্রশ্নের উত্তরে বাবা সাহেবের জবাব ছিল, "শেষবার তিনি তাড়াহুড়ো করে সম্পূর্ণ উত্তর দিতে সক্ষম হননি। আমি খুব ভেবেচিন্তে বলেছিলাম যে আমি সংবিধান পোড়াতে চাই।" ডাঃ আম্বেদকরের কথায়, "আমরা মন্দির তৈরি করি যাতে ঈশ্বর এসে সেখানে বাস করতে পারেন। যদি অসুররা এসে ভগবানের সামনে থাকতে শুরু করে, তাহলে মন্দির ধ্বংস করা ছাড়া আর কি উপায় থাকবে। কেউ মন্দির তৈরি করে না এই ভেবে যে সেখানে রাক্ষস বাস করতে শুরু করবে। সবাই চায় মন্দিরে দেবতারা বাস করুক। এ কারণেই সংবিধান পোড়ানোর কথা উঠেছিল।"
ডাঃ বাবাসাহেব ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। স্বাধীন ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী। ভারতীয় সংবিধানের প্রণেতা। জীবন্দ কিংবদন্তী। বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর (১৮৯১-১৯৫৬) এক অবিশ্বাস্য প্রতিভা, যার তল পাওয়া দুষ্কর। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘ম্যান অফ মেনি পার্টস’ বা নীরদ সি চৌধুরীর ভাষায় ‘স্কলার এক্সট্রাঅর্ডিনারী’, বাবাসাহেব ছিলেন ঠিক তা-ই। ৬৫ বছরের জীবনে এমন কোনও বিষয় বা আঙ্গিক নেই, যা তিনি ছুঁয়ে দেখেননি। যে বিষয় হাতে নিয়েছেন, সোনা ফলিয়েছেন৷ একদিকে তিনি রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক, জুরি সদস্য, সমাজসেবী, অন্যদিকে দলিত অন্ত্যজ ও নিম্নবর্গের অধিকার আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ, সুলেখক, প্রাবন্ধিক, বৌদ্ধশাস্ত্রজ্ঞ, নারী শিক্ষা ও জাগরণের হোতা, ভোজনরসিক, সুবক্তা, আইনজ্ঞ, নির্ভেজাল বইপোকা…এ তালিকা সহজে ফুরোবার নয়৷ তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হল, তিনি ভারতীয় সংবিধানের জনক। স্বাধীনতা সংগ্রামে অনন্য এক সেনানী, যিনি বন্দুকের চেয়েও বই ও কলমের শক্তিতে বিশ্বাস রাখতেন বেশি। তাঁর আঁকা অসংখ্য ছবি তাঁর নিবিড় শিল্পীমনের পরিচায়ক। মজার বিষয়, আদ্যোপান্ত মজলিশি স্বভাবের মানুষটির একটি বিশেষ পরিচয় আজও বহুজনের অজানা। সেটি হল শাস্ত্রীয় ও লোকসঙ্গীতের প্রতি আকণ্ঠ অনুরাগ৷ খুব কম মানুষই জানেন যে বাবাসাহেব একজন সুগায়ক ছিলেন। ছিলেন তালবাদ্যে পারঙ্গম। চমৎকার ‘ডাফলি’ বাজাতেন ও শেষ জীবনে নিষ্ঠাভরে শিখেছেন বেহালা। প্রৌঢ়ত্বে এসে সেই নিভৃত সঙ্গীতসাধনা তাঁকে দিয়েছিল অপার শান্তির সন্ধান। বিশিষ্ট আম্বেদকর-অনুরাগী, মরাঠি লেখক এবং জীবনীকার ভগবানরাও চন্দেও খড়মোরে ১২ খণ্ডে লিখেছিলেন বাবাসাহেবের পূর্ণাঙ্গ জীবনী। তা থেকে জানা যায়, বাবাসাহেব তাঁর শৈশব থেকেই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। মেধাবী পড়ুয়া হওয়ার পাশাপাশি খেলাধূলায় ছিল তাঁর উৎসাহ। এর মধ্যে ক্রিকেট ছিল তাঁর বিশেষ প্রিয়। ক্লাস এইট থেকে টেন পর্যন্ত বম্বের এলফিনস্টোন হাইস্কুলে পড়ার সময় স্কুল ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন। ভাল ব্যাটসম্যান ছিলেন। আর এই সময় থেকেই সঙ্গীতের প্রতি একটু একটু করে অনুরক্ত হতে শুরু করেন ভীমরাও। অবশ্য এর পিছনে ছিল তাঁর বাবার বিশেষ অবদান। বাবাসাহেব তাঁর পাহাড় প্রমান কাজের মধ্যে সুযোগ পেলেই বসে যেতেন বেহালা নিয়ে। সবিতা আম্বেদকর জানিয়েছেন, বেহালার ছড় হাতে তুলে নিলে নাওয়া খাওয়া ভুলে যেতেন আম্বেদকর। শারীরিক কষ্টের জন্য বেশিক্ষণ বাজাতে পারতেন না। তখন ফিরে যেতেন আঁকায়। কষ্ট কম হলে আবার তুলে নিতেন বেহালা।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী রমা বাঈয়ের প্রয়াণের (সাল ১৯৩৫) পর ভেঙে পড়েছিলেন আম্বেদকর। দীর্ঘ ২৯ বছরের বৈবাহিক সম্পর্ক তাঁদের। ১৯০৬ সালে যখন রমাবাঈকে বিয়ে করেন ভীমরাও, তখন তাঁর বয়স ১৫, রমাবাঈ মাত্র ৯। পাঁচ সন্তানের জননী, আম্বেদকরের প্রিয় মানুষ ‘রামু’ আজীবন তাঁর স্বামীর পাশে ছিলেন। আম্বেদকর নিজে বলেছিলেন, “রমাবাঈ না থাকলে আম্বেদকর কখনই আম্বেদকর হয়ে উঠতে পারত না।” রমাবাঈয়ের শোক ভুলতে নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দেন আম্বেদকর। ফলে নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় তাঁর। হাই ডায়বেটিস, হৃদরোগজনিত সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ইত্যাদিতে প্রায়ই অসুস্থ হয়ে থাকতেন ভীমরাও। এই সময় বম্বের ভিলে পার্লেতে ডাঃ এস এম রাও-এর কাছে চেক আপের জন্য যেতেন। সেখানেই তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় সারদা কবীরের। সারদা নিজে দলিত পরিবারের মেয়ে, অত্যন্ত মেধাবী ও পেশায় চিকিৎসক। চেক আপের সময় তাঁরা কাছাকাছি আসেন। বাবাসাহেবের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হন সারদা। সারদার মধ্যে রমাবাঈয়ের প্রচ্ছন্ন ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন আম্বেদকর। এর পর ধীরে ধীরে তাঁরা ঘনিষ্ঠ হন ও ১৯৪৮ এর ১৫ এপ্রিল বিবাহ করেন। তার একমাস আগে ১৬ মার্চ দাদাসাহেব গাইকোয়াড়কে লেখা চিঠিতে ভীমরাও বলেন, “রমার চলে যাওয়ার পর দ্বিতীয় বিবাহের কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু সারদাকে দেখে সেই সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হলাম। সারদার মধ্যেই রমাকে খুঁজে পেলাম নতুন করে।” বিয়ের পর মরাঠি রীতি মেনে সারদার নতুন নাম দেন 'সবিতা'। অনুরাগীরা শ্রদ্ধায়, ভালবাসায় নাম রেখেছিলেন ‘মাঈসাহেব’ বা ‘মাঈ’। সস্ত্রীক ভীমরাওকে দেখতে প্রতিদিনই দিল্লির পৃথ্বীরাজ রোডের বাড়িতে উপচে পড়তো ভিড়। আম্বেদকর ফেরাতেন না কাউকেই। যথাসাধ্য বাড়িয়ে দিতেন সাহায্যের, সহমর্মিতার হাত।
১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর। দিল্লির আলিপুর রোডের বাড়ি। দিন আগেই শেষ করেছেন “দ্য বুদ্ধা অ্যান্ড হিজ ধর্মা”র ফাইনাল ম্যানুস্ক্রিপ্ট। চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ, রক্তে শর্করার হার মারাত্মক, রয়েছে বিকল হয়ে আসা হৃদযন্ত্রের সমস্যা। ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী তিনি। সবাই বুঝতে পেরেছিলেন শেষ সময় আগত৷ ৫ ডিসেম্বর রাতে সামান্য খেয়ে স্ত্রী সবিতাকে ইশারা করে কিছু বলেন। স্বামী কী চাইছেন, তা বুঝতে পেরেছিলেন সবিতা। প্রাণাধিক প্রিয় বেহালাটিকে বাবাসাহেবের পাশে রেখে দেন তিনি। বেহালাটি আলতো করে ছুঁয়ে ঘুমিয়ে পড়েন বাবাসাহেব। সেই ঘুম আর ভাঙেনি তাঁর।
ভাবতে অবাক লাগে আজ স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব পার করেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আস্ফালনে বিপন্ন সংবিধান গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত। চারিদিকে মেরুকরণের দামামা। মানুষের মানুষের বিভাজন বৈষম্য। সবকিছুতেই ঢুকে গেছে ভেদাভেদের রাজনীতি। সংবিধানের শপথ নিয়ে নেতা-মন্ত্রীরা গণতন্ত্রকে পদদলিত করছেন। ভেবে শিউরে উঠি, বিজ্ঞান প্রযুক্তির যুগে মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সুকৌশলে ধর্মীয় বিভাজনের জালে মানুষে মানুষে শুরু হয়েছে অস্থিরতা অবিশ্বাস অসহিষ্ণুতা বাতাবরণ। বিশেষ করে বিজেপি শাসিত ভারতবর্ষে প্রতিনিয়ত সংখ্যালঘুদের অধিকার, ভারতবর্ষের বৈচিত্র ঐতিহ্য সনাতন সংস্কৃতি সর্বধর্ম সমন্বয়ের শাশ্বত ভাবনা আদর্শ ভেঙে পড়ছে।
সংবিধানের লঙ্ঘন করে গণতন্ত্রকে ভূলুণ্ঠিত করে চলছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আস্ফালন। বর্তমান সঙ্কটের মুহূর্তে ভারতের বহুত্ব সনাতন ঘরাণার সাম্প্রদায়িক, সম্প্রীতি, অখন্ডতা, সংহতি, সর্বোপরি গণতন্ত্রকে বিকশিত ও সর্বজনীন করে তুলতে বি আর আম্বেদকরের জীবন দর্শন স্মরণ পালন ও প্রাত্যহিক চর্চা একান্ত জরুরী।
আজ তাঁর ১৩৩তম জন্মদিবসে ভারতমাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, মহাপুরুষ আম্বেদকরকে জানাই শ্রদ্ধা ও অন্তঃস্থ ভলোবাসা। তার অমৃতবাণী, পথ চলা, জীবন সংগ্রাম প্রতিটি ভারতীয়দের সংকটমোচন, উৎসাহ প্রদান ও অনুপ্রেরণায় চির বার্তাবাহক। আম্বেদকরের অনুপ্রেরণায় এখনো দলিতরা তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার। তার গোটা জীবনই যেন এক প্রেরণার বাতিঘর। সেই ক্লাসে পাটের বস্তা বিছিয়ে বসা ছেলেটির বিশ্বব্যাপী সমাদৃত জ্ঞানী হয়ে ওঠা, দলিতদের নিয়ে তার আন্দোলন গড়ে তোলা, এরপর তার সংবিধানের স্থপতি ও ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী হওয়া - পুরো জীবন যেন অনন্য এক সংগ্রামী সফর। তার জীবনের অন্য কোনো দিক নিয়ে অন্য কোনো লেখায় আলোচনা করা যাবে। আজ এ পর্যন্তই থাক।
#সংগৃহীত
★ তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার :- Last Few Years of Dr. Ambedkar - Nanak Chand Rattu, Amrit Publishing House, Little Known Facets of Dr. Ambedkar - Nanak Chand Rattu, Amrit Publishing House, Maharashtra Times, Times of India, The Hindu, Prabuddha Bharat, Lokmat Times & Dr. Ambedkar Foundation, New Delhi, সব বাংলায়, প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত - বাংলা লাইভ ডট কম, সাময়িকী ডট কম, রোর মিডিয়া, এই সময়, pmindia.gov.in, main.sci.gov.in, inc.in, pib.gov.in, mea.gov.in ও উইকিপিডিয়া।