16/06/2026
মেদিনীপুর জেলার মুসলমান পটুয়া সমাজ ও পটচিত্র উদ্ভাবনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য৷
---- ওয়াহেদ মির্জা
সংস্কৃত ভাষার " পট্ট বা পট বলতে মূলত কাপড় বুঝায় ৷ বাংলায় পট বলতে বোঝায় এমন একটি ক্যানভাস যার উপর ছবি বা অলঙ্করণ আঁকা হয়৷শিল্পীরা (পটচিত্র অঙ্কন)
সাধারণত পটুয়া নামে পরিচিত; কিন্তু তাঁরা আরও সম্মানজনক একটি নামে চিত্রকর পরিচিত৷ যার আক্ষরিক অর্থ হলো ছবি -নির্মাতা৷ এটি লক্ষণীয় যে ,এই শব্দটি একটি পদবি এবং একটি জাতিগত উপাধি হিসেবেও গৃহীত হয়েছে৷ সাম্প্রতিক সময়ে নারীরা পট্ট শিল্পী হিসেবে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়ে এসেছেন৷পট বা কাপড়ের উপর ধারাবাহিক চিত্র এঁকে লাঠির সহিত জড়িয়ে রেখে তা'ই ঘুরিয়ে একে একে ছবি গুলি দেখিয়ে পটুয়ারা ছড়া ও গানের ভেতর দিয়ে কাহিনী বিবৃত করে৷ পরবর্তীকালে কাগজ আবিস্কৃত হলে তাতে ছবি আঁকা চালূ হয়৷কিন্তু পূর্বের পট নামটি অপরিবর্তিত থেকে যায়৷প্রাচীনকালে পট ছিল যোগাযোগের মাধ্যম। পটশিল্পীরা ছিলেন একাধারে লেখক, চিত্রকর ও গায়ক। তখন পট তাদের কাছে কোন বিক্রয়যোগ্য পণ্য ছিল না।
বর্তমানে পটচিত্র শুধু কাপড়ে সীমাবদ্ধ নেই; মাটির সরা, শাড়ি, পাঞ্জাবি, শাল ও ট্রে, কোস্টার, মগ, কেটলির মতো গৃহস্থালীর জিনিসপত্রে ছবি আঁকছেন৷ এখন পটচিত্র আন্তর্জাতিক বাজারে খ্যাত৷
এই পটচিত্রের ঐতিহ্য শত শত বছর ধরে বংশপরম্পরায় এসেছে কিভাবে তা আলোচনা করা যাক ৷ আমরা জানি আমাদের ভারতবর্ষের আদি জনজাতি হল সাঁওতাল ,কোল ,মুন্ডা ,হো ইত্যাদি৷ শিক্ষিত সমাজ জনজাতির সংস্কৃতিকে "লোক" তকমা দিয়ে সীমাবদ্ধ রেখেছে৷ যাইহোক এই পটচিত্র
সাঁওতাল, হো, মুন্ডা, জুয়াং এবং খেরিয়াদের মতো উপজাতিদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল, যারা তাদের প্রথম পূর্বপুরুষ পিলচু হারাম ও পিলচু বুড়ির জন্ম, তাদের সাত পুত্র ও সাত কন্যার জন্ম এবং কীভাবে এই সাত ভাইয়ের তাদের বোনদের সাথে বিবাহ হয়েছিল, তা চিত্রিত করে 'পটচিত্র' আঁকত।সাঁওতাল সৃষ্টিতত্ত্ব বা পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুড়ি হলেন সমগ্র সাঁওতাল জাতির আদি পিতা ও আদি মাতা৷
পুরাণ, মহাকাব্য, প্রাচীন সাহিত্য এবং ঐতিহাসিক বিবরণে পটচিত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর চিত্রকলার শৈলী মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা এবং অজন্তার গুহাচিত্রের অনুরূপ। ২৫০০ বছরেরও বেশি পুরোনো সাহিত্যকর্মে 'পটুয়া' এবং 'চিত্রকরদের' উল্লেখ পাওয়া যায়। কিছু গবেষকের মতে, 'পটশিল্প' মূলত সাঁওতালদের (আদিবাসী সম্প্রদায়) একটি শিল্পকলা ছিল।
চন্দ্রগুপ্তের আমলে শুরু হওয়া চিত্রের এই মাধ্যম ধীরে ধীরে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন চিত্রকরেরা। শুধু রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নয়, এর প্রভাব পড়ল ধর্মীয় ক্ষেত্রেও। জৈনদের চব্বিশতম বা শেষ তীর্থঙ্কর মহাবীরের উপদেশাবলী সমৃদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থ ‘কল্পসুত্রে’ও উল্লেখ রয়েছে এই চিত্রকরদের।লোকচক্ষুর আড়ালে অজন্তা-ইলোরা গুহা নির্মাণেও এই চিত্রকরদের হাত ছিল। কালিদাসের ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম্’ ও ‘মালবিকাগ্নিমিত্রম্’ নাটকে, বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’ এবং বিশাখদত্তের ‘মুদ্রারাক্ষসে’ চিত্রকরদের কথা রয়েছে। ‘আকবরনামা’-সহ একাধিক মোঘল গ্রন্থে রয়েছে চিত্রকরদের প্রসঙ্গ।কেউ কেউ বলেন আজকের এই পটশিল্পের শুরু ওড়িশায় কারণ ,ওড়িশার রঘুরাজপুরের পটশিল্প হাজার বছরেরও প্রাচীন। ওড়িশা থেকেই নাকি ধীরে ধীরে এই পটশিল্প ছড়িয়ে পড়ে বাংলা-সহ বিহার এবং ঝাড়খণ্ডের কিছু অংশে৷ তবে ধর্ম চেতনা থেকে পটচিত্রের উদ্ভাবন- ঐতিহাসিক সূত্রানুসন্ধানে বিশেষজ্ঞরা তার মর্মোদ্ধার করেছেন৷ বাংলায় বৌদ্ধধর্মের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে পটুয়ারা এই ধর্ম গ্রহণ করে। বৌদ্ধ রাজা ও ভিক্ষুরা বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য স্ক্রোল চিত্রকলার ব্যাপক ব্যবহার করতেন এবং এই সময়ে পটচিত্র সম্ভবত বালি, জাভা, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া এবং তিব্বতে ছড়িয়ে পড়ে।
রবীন্দ্র মজুমদার লিখেছেন ,বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বুদ্ধ-জীবনী ও জাতকের কাহিনী পটচিত্রে বিধৃত করা হত৷ আট শতকের রচনা বিশাখা দত্তের "মুদ্রারাক্ষস " নাটকে তার পরিচয় আছে৷ তিনি আরও বলেছেন ,মধ্যযুগে বাংলার পটীদাররা বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার উদ্দেশ্যে এর পুন: প্রচলন করেন৷ তাঁর মতে ,পটের চিত্রবস্তুতে কৃষ্ণকালী সেজন্য প্রাধান্য লাভ করে৷ এটা হল ষোল শতকের কথা৷ গুরুসদয় দত্তের মতে ,বাংলার পটচিত্র ও পটুয়া সঙ্গীত অধ্যাত্মভাবসজ্ঞাত ৷ সাত শতকের রচনা বাণভট্টের " হর্ষচরিত " কাব্যে যমপটের উল্লেখ আছে৷ বাংলার পটুয়ারা পালাশেষে যমপট দেখিয়ে থাকে৷এরূপ রীতি সাদৃশ্যে তিনি মনে করেছেন ,বাংলার পটশিল্পীরা বৌদ্ধযুগের চিত্রকরদের উত্তর সাধক ৷ ড: দীনেশচন্দ্র সেন বলেছেন ,পটুয়াদের পূর্বপুরুষ " মস্করী' উপাধিধারী বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বুদ্ধের সময় হতে পটচিত্র এঁকে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করত৷ ভিন্ন ভাষার লোকের কাছে ছবির সাহায্য ধর্মমত প্রচার সহজ হত৷ বাংলাদেশের মস্করীদের নাম পটীদার ৷ ব্রাম্মণ্যদের দ্বারা অত্যাচারিত পটুয়ারা মূসলমানদের আগমনের পর ইসলামধর্ম গ্ৰহণ করে ,চিত্রকররা ইসলামের অনুসারী হয়ে ওঠে।কিন্তু তারা পৈতৃক বৃত্তি ত্যাগ করেনি৷
বাংলার মধ্যে বীরভুম, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, মেদিনীপুর এগুলো ছিল পটচিত্রের কেন্দ্র।
এছাড়া অবিভক্ত মেদিনীপুরের ঘাটাল ঘাটালের দাসপুর ,নন্দিগ্ৰাম ,পিংলাতে পাটিদারদের বসবাস৷ পটাশপুরের গোপালপুরে কিছু পটিদার বসবাস দেখা৷ তারা পটচিত্রে অঙ্কণ করেন না ,কিন্তু লোকজন পাটিদার বলে৷পিংলা” শব্দটি সংস্কৃত বা প্রাচীন ইন্দো-আর্য মূল ‘পিঙ্গলা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ তামাটে বা হলদে-বাদামী বা লালচে-সোনালী রঙ। এটি প্রায়শই একটি উষ্ণ, মাটির মতো আভা বোঝাতে ব্যবহৃত হয় — ঠিক একই রঙের পরিসর যা ল্যাটেরাইট মাটিতে দেখা যায়, যা বাংলার ঐ অঞ্চলে অত্যন্ত সহজলভ্য। শব্দটি সরাসরি রঙ এবং মাটির রঞ্জকের সাথে যুক্ত, যা প্রকৃতপক্ষে খুব কাব্যিক এবং পিংলা পটুয়াদের প্রাকৃতিক, রঙ-ভিত্তিক ঐতিহ্যের সাথে প্রতীকীভাবে সংযুক্ত। মেদিনীপুর তথা বাংলার মধ্যে পিংলার নয়াগ্রাম জগদ্বিখ্যাত।সবং ও পার্শ্ববর্তী পিংলা অঞ্চলে আদিবাসী অধ্যুষিত হলেও বেশিরভাগ মুসলিম চিত্রশিল্পীরা (যাঁরা 'পটুয়া' নামে পরিচিত) আবহমান কাল ধরে পটচিত্রের চর্চা করে আসছেন ৷এই গ্রামের বেশিরভাগ পটুয়ারাই কিন্তু মুসলিম ধর্মাবলম্বী৷ হিন্দু পটুয়ারাও আছেন৷স্থানীয়ভাবে পটুয়া গ্রাম ( পটুয়া বা পটচিত্র শিল্পীদের গ্রাম) নামে পরিচিত নয়ার ১৭৬টি পরিবারের সবাই পটচিত্র তৈরিতে নিযুক্ত৷ মুসলিম হলেও তারা রামায়ণ, মহাভারত, দুর্গা কাহিনী মঙ্গলকাব্যের বিভিন্ন পটচিত্র এঁকে থাকেন। সেই জন্যই হয়ত ধর্মীয় সম্প্রীতির মেলবন্ধনের ছবি এই গ্রামেই ধরা পরে।তাঁদের তৈরি শিল্পকর্ম এখন দেশ-বিদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সমাদর লাভ করেছে৷
মেদিনীপুরে পটচিত্র ও গানের ভেতর দিয়ে যে সব ধারা সংরক্ষিত তার অধিকাংশ পৌরাণিক আখ্যায়িকা অবলম্বনে রচিত৷ সাধারণত কৃষ্ণলীলা ,রামলীলা ,গৌরাঙ্গলীলা , শিবপার্বতীলীলায় প্রভৃতি চিত্র ও গানের উপজীব্য বিষয়৷ গাজীর পট " লৌকিক কাহীনিকে ( গাজী গানের পালা) আশ্রয় করে চিত্রিত৷ কাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধারাবাহিকভাবে এঁকে পট দেখানো বা পট নাচানো হত৷ পটের কাহিনী আগে ,চিত্র পরে৷ এদিক থেকে পটে কাহিনীর উদ্ভব ও প্রচার কাল জানলে পটের সময় জানা যাবে৷রাধা - কৃষ্ণ ও রাম - সীতার কাহিনী সংস্কৃত ভাগবত ও রামায়ণ থেকে এদেশে প্রচার লাভ করে ৷ আর্য সংস্কৃতির সহিত বাঙালি পরিচয় প্রাচীন কাল থেকে ঘটলেও আপামর জনসাধারণের কাছে এর সামগ্ৰিক প্রভাব মধ্যযুগে কৃত্তিবাস ,মালাবর বসু প্রমুখ কবির বাংলা অনুবাদ গ্ৰন্থের মাধ্যমে ব্যাপকতা হয়েছিল৷ এঁরা পনরো শতকের কবি৷যে সময় থেকে কৃষ্ণলীলায়,রামলীলা পটচিত্রের প্রচলণ হতে পারে৷ চৈতন্যদেবের ব্যক্তিজীবন ও তাঁর প্রবর্তিত ধর্মের প্রভাবের কাল ষোল শতক ৷১৫১০ সালের শুরুর দিকে (আনুমানিক ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসে) সন্ন্যাস গ্রহণের পর পুরী (নীলাচল) যাওয়ার পথে শ্রীচৈতন্যদেব মেদিনীপুরের (অধুনা পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর) ওপর দিয়ে পদযাত্রা করেছিলেন। ‘শ্রীচৈতন্যের পুরী যাত্রা পথ’ অনুযায়ী তিনি জলপথ ও স্থলপথের একাধিক ঐতিহাসিক রুট ব্যবহার করেছিলেন।
বাংলায় যখন পীর দরবেশের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল তখন গাজী পীরকে কেন্দ্র করে পীরের পাঁচালী প্রচলীত হয়৷ পটুয়ারা তাঁকে আশ্রয় করে " গাজীর পট" অঙ্কন করেছে৷ পনর ষোল শতকের দিকে বাঙালির নিজস্ব ভাবনা কল্পনা অনুযায়ী পটচিত্র অঙ্কিত ও প্রচারিত হয়েছিল৷ ষোল শতকের কবি মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল কাব্যে পটচিত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়৷ পটুয়াদের জাতিত্ত্বের অনুসন্ধান করলেও এমতের সমর্থন পাওয়া যায়৷ গুরুসদয় দত্ত পটচিত্রকারের কাছ থেকে একটি কিংবদন্তি সংগ্রহ করে বলেছেন - " পটুয়ারা বিশ্বকর্মার বংশধর ,মহাদেবের বিনা অনুমতিতে তাঁর ছবি আঁকলে তুলির অবমাননায় মহাদেব অভিশাপ দেন৷ - তোরা ছোট হয়ে সমাজে থাকগে'৷ সব জ্ঞাতিরা একত্রে মহাদেবের কাছে জীবিকা সমন্ধে সাশ্রুনেত্রে অনুরোধ করলে তিনি বলেন ,তোরা হিন্দুও হবি না ,মুসলমানও হবি না ৷ তোরা মুসলমানের রীত করবি আর হিন্দু কর্ম করবি অর্থাৎ ছবি আঁকবি ও পড়বি৷দত্ত মহাশয় পটুয়াদের কাছ থেকে শোনা উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন ," সেই থেকে আমরা মুসলমানের মত নামাজ করি আর হিন্দু দেবদেবতার ছবি আঁকা ও সেই গান করি৷ বিভিন্ন পেশাদার মুসলমানদের বর্ণনার সাথে একটি চরণে পটুয়াদের কথা আছে ৷ চরণটি এরূপ " পট পঢ়িয়া কেহ ফিরিয়ে নগরে৷( কবিকঙ্কন চন্ডী৷ পৃ-৮৬)৷ এখানে মহাদেবের অংশটুকু কাল্পনিক ,কিন্তু বাকী অংশ যেমন পটুয়ারা মুসলমানের মত নামাজ পড়ে হিন্দু দেবদেবীর ছবি আঁকে ও গান গায় ইত্যাদি বিষয় মোটেই অসত্য নয় ৷ মহাদেব যখন অভিশাপ দিচ্ছেন তখন মুসলমানরা এদেশে প্রতিষ্ঠিত ,হিন্দু - মুসলমান পাশাপাশি বাস করছে৷ মুসলিম বিজয়ের পর বৌদ্ধরা ও নিন্মবর্ণের হিন্দুরা ইসলাম ধর্ম গ্ৰহণ করে মুসলমান সম্প্রদায়ের কলেবর বৃদ্ধি করে৷ড: দীনেশ সেনের মতে ,চৌদ্দ শতকের দিকে ধর্মান্তরিতকরণের পালা শেষ হয়৷
এসব প্রামানিক নিদর্শন থেকে বলা যায় ,পালযূগে বৌদ্ধ মস্করীরা যে পটচিত্র ও পটগীতির প্রচরণ করেছিল তা ক্রমশ : ব্যাপকতা লাভ করে মুসলিম বিজয়ের পরে এদেশে লৌকিক সংস্কৃতি ও পৌরাণিক সংস্কৃতি সর্বসাধারণের কাছে মর্যাদা ও জনপ্রিয়তা লাভের সময় হতে৷।পালরাজাদের মত মুসলমান সুলতানারা স্থানীয় সংস্কৃতি পৃষ্ঠপোষকতা দান করে ছিলেন৷শত শত বছর ধরে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই শিল্পে পটুয়ারা শুধু ছবিই আঁকেন না, পট প্রদর্শনের সময় সুর করে লোকগাথা বা 'পটের গান'ও গেয়ে শোনান৷জানা যায় যে ,মুঘল শাসনকালে কিছু শিল্পী ইসলাম ধর্ম গ্ৰহণে কাহিনী বলার এক নতুন ঐতিহ্য শুরু করেন৷ ফ্র্যাঙ্ক জে . করম যিনি বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান এবং তিনি ভালো বাংলা বলেন ,তিনি " ভিলেজ অফ পেইন্টার্স : ন্যারেটিভ স্ক্রোলস ফ্রম ওয়েস্ট বেঙ্গল " নামে একটি বই লিখেছেন ,যা নয়া মেদিনীপুরে বসবাসকারী একদল দক্ষ শিল্পীকে নিয়ে লেখা৷ গুরুসদয় দত্ত " পটুয়া সংগীত" নামে একটি বই লেখেন ১৯৩৯ সালে৷বাংলায় দুরকমের পটচিত্র প্রচলিত৷ গুরুসদয় দত্ত এগুলির নাম করেছেন একচিত্র বা চৌকাপট এবং বহুচিত্র বা দীর্ঘপট ৷ হিন্দু দেব- দেবীর সঙ্গে মুসলমানদের পীর -ফকির বিচিত্র কাহিনী সংবলিত চিত্র অঙ্কন করা হত৷কালিঘাটের পটচিত্র প্রথম শ্রেণীভুক্ত৷ এগুলি স্বয়ং সম্পূর্ণ চিত্র৷ মানুষ ,গরু ,বাঘ ,পাখি প্রভৃতি এতে চিত্রিত হয়৷ ধর্মপট অনেকগুলি চিত্রের সমন্বয়ে একটা কাহিনীর ধারাবাহিক ঘটনা অবলম্বনে রচিত৷ লাঠিতে জড়ান এ পটচিত্রেই প্রকৃতপক্ষে খাঁটি বাঙালির চিত্ররীতির নিদর্শন আছে৷ এ ধরনের পট বাংলায় প্রায় সব অঞ্চলে প্রচলিত৷
একমাত্র গাজীর পটে কিছুটা মুসলমানী ঐতিহ্য আছে৷ লৌকিক সংস্কৃতিতে গাজীপীর হলেন বাঘের দেবতা৷ গাজীর পট পূর্ববঙ্গে প্রচলিত ছিল৷বিশেষজ্ঞরা লিখেছেন ,গাজীর জীবনের বিভিন্ন অলৌকিক কাহিনী অবলম্বনে ছবি এ়ঁকেছে পটুয়ারা তার গাজীর পটে৷সে পট লাঠির আগায় মানচিত্রের মত ঝুলিয়ে পয়ারের মাধ্যমে তার ব্যাখা দিয়ে ফিরছে গ্ৰাম থেকে গ্ৰামান্তরে মজলিসে৷
অন্যত্র তিনি গাজী কালুর পটসম্পর্কিত একটি গানের অংশ বিশেষ উল্লেখ করেছেন৷
" দেওয়ান কোন গুনে তরাইয়া লত্ত ভাই গাজীর নামে
গাজী কালু দুই ভাই আড়াঙ্গি উড়াইল
জঙ্গলার র্যত বাঘ দৌড়িয়া পলাইল৷
একি বাঘ ,নেকি বাঘ ,চোখ পাকাইয়া চার
সুন্দর বন্যা ববাঘটায় বৈরাগী লইয়া যায়,৷
গোয়ালার মায় বলে হায়রে হায়
কাল গাইয়ে ধলা বাছুর বাধে লইয়া যায়
গোয়খলার মায় বলে হায়রে হায় ৷
কাল গাইয়ের ধশষলা বাছুর বাধে লইয়া মায়
গোয়ালার মায় বুলে কোমর বুড়ী ৷
বাধ মাবিতে লইয়া যায় দোয়ার বাদ্ধা লরী"
উক্তটির মধ্যে পটের চারটি স্বতন্ত্র কথাচিত্র পাওয়া যায় ৷ড: সুকুমার সেন তাঁর ' ইসলামি বাংলা সাহিত্য " গ্ৰন্থে " গাজীর পট" পাদনামে একটি আলোকচিত্র দিয়েছেন৷ তাতে পাগড়ি পরিহিত শ্মশ্রুধারী ব্যাঘ্রোফবিষ্ট গাজীর মানবমূর্তি অঙ্কিত দেখা যায়৷পটের মূল অংশ সহিত ক্ষুদ্রাকার আরও অনেক চিত্র আছে ।মকরবাহিনী গঙ্গাদেবী ,বাঘের কবলে গরু৷ মগুরধারী দক্ষিণ রায় প্রভৃতি৷ আশরাফ সিদ্দিকী কারবালার যুদ্ধ শিবির ও বিবি সোনাভান প্রভৃতি পটের কথা বলেছেন৷।পটগীতি থেকে পটচিত্রের স্ত্রষ্ঠ আভাস পাওয়া যায় অর্থাৎ ঘোড়ায় সোয়ার হয়ে সোনাভান যুদ্ধে চলেছে ,তার হাতে চাবুক ,তা দিয়ে ঘোড়াকে আঘাত করছে সে৷ ঘোড়ার ভঙ্গীও বেগবান৷সবকিছু মিলিয়ে ছবিটি সজীব ও গতিশীল৷ পটগীতি ও পটচিত্র শিল্পকলার অভিন্নইত্মা-।পটগীতিতে যা বাঙ্গ্যয় পটচিত্র রূপময় ৷ বহিজগতের সহিত প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থেকে বাংলার গ্ৰামবাসীর দীর্ঘকাল ধরে এরই সাহয্যে চিত্ররসপিপাসা নিবৃত্ত করেছে৷
ঐতিহ্যগত ভাবে পটুয়ারা পাতা ,ফল ,ফুল ,গাছপালা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান থেকে রং সংগ্রহ করে পরিবেশবান্ধব রঙের কার্যকর ব্যবহার করে৷ উদাহরণস্বরূপ ,তারা লটকন পাতা থেকে জাফরান ,অপরাজিতা ফুল থেকে নীল ,সেগুন গাছ থেকে বাদামী ,হলুদ থেকে হলুদ ,কাঠকয়লা থেকে কালো ,সীম বা বাবল গাছ থেকে সবুজ ,ঘুসুম মাটি থেকে সাদা ইত্যাদি রং সংগ্রহ করে ৷ এই রং দিয়ে কাপড়ের উপর আঠা দিয়ে শক্ত কাগজ জুড়ে তৈরি হয় পট। এগুলি মূলত তিন ধরণের হয়। সাধারণত পটচিত্র ৩ থেকে ১০ ফুট কিংবা তারও বেশি লম্বা হয়ে থাকে। কোনো ঘটনা বা কাহিনীর ধারাবাহিক বর্ণনা তুলে ধরা হয় এই পটে। একটি মাঝারি আকারের পটচিত্র তৈরি করতে তিন সপ্তাহের কিছু বেশি সময় লাগে এবং এটি প্রায় ৭,০০০ টাকায় বিক্রি হয়। এর চেয়ে কিছুটা বড় পটচিত্রগুলো ১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত দাম পেতে পারে; খুব বড় পটচিত্রগুলোর দাম কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে । আজকে বাজারজাত হওয়ায় এগুলো জনপ্রিয় ও লাভজনক এবং ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করছে। তবুও প্রচন্ড প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে একটি প্রাচীন পেশা অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন৷নয়ার পটচিত্রের বিষয়বস্তুর পরিধি যথেষ্ট বিস্তৃত, পৌরাণিক থেকে শুরু করে সামাজিক, আর্থ-সামাজিক, ঐতিহাসিক, সমসাময়িক ইত্যাদি বিষয়েও পট তৈরী করেন শিল্পীরা। তাঁদের তুলির টানে যেমন জীবন্ত হয়ে ওঠে পুরাণের বেহুলা-লক্ষীনদর, রাম-লক্ষণ-সীতা, চৈতন্য, শিব-পার্বতীর মত চরিত্র, তেমনি বর্তমানও সমানভাবে উজ্জ্বল যেমন – কন্যাশ্রী, নির্ভয়াকান্ড ইত্যাদি। বর্তমানে পটচিত্র আর থেমে নেই পৌরাণিক কাহিনীতে। এখন পটে আঁকা হয় নানা সামাজিক বিষয়, দুর্যোগ এমনকি ধর্ম সমন্বয়ের কথা। পটচিত্র এখন আর শুধু আটকে নেই কাপড়ের ক্যানভাসে। এখন পটচিত্র তুলে ধরা হয় শাড়ি, ওড়না, ব্যাগ, টি-শার্ট, কাঁসার থালা, ট্রে, কেটলি, ছাতা, কুলো, কাপ, প্লেটের মতো বিভিন্ন দৈনন্দিন ব্যবহৃত জিনিসে। বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলার ঐতিহ্যমন্ডিত পটচিত্র পরিদর্শনে UNESCO -র পরিদর্শক টিম ও প্রতিনিধি সিভিস্টিয়েন কার্টিস এসেছিলেন৷ পিংলার এই আন্তর্জাতিক পট শিল্পকে কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি দাবী দীর্ঘদিনের৷ইতিমধ্যেই পিংলার পটুয়া ও সবংয়ের মাদুর শিল্পীদের হাতে জি. আই শংসাপত্র তুলে দেওয়া হয়েছে৷ "চিত্রতরু " ভবন তৈরি করা হয়েছে৷পিংলার নয়া কে আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে৷২০০৯ সাল থেকে এই গ্রামে মেলা শুরু হয়। আগে এই মেলার আয়োজন করা হত ৩ দিনের। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১০ দিনের। মোটামুটি ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে এই মেলার আয়োজন করা হয়। এই রিসোর্স সেন্টারটি পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলার পটচিত্র শিল্পীদের দ্বারা গঠিত ‘চিত্রতরু’ ক্লাস্টারের অন্তর্গত। বাংলানাটক ডট কম কর্তৃক গৃহীত ‘এথনো-ম্যাজিক গোয়িং গ্লোবাল’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় এটি নির্মিত হয়েছে।পিংলায় প্রতি বছর অনুষ্ঠিত ‘ পটমায়া’ -র মতো উৎসবগুলো বিশ্বজুড়ে দর্শক ও গবেষকদের আকর্ষণ করে। ফলে পিংলা হয়ে উঠেছে " Village of Painters ( চিত্রকরদের গ্ৰাম) ৷
তথ্য:
1.Village of Painted : a Visit to Naya ,Pingla - Sourabh Datta Gupta
২. Midnapore .in
৩.যেখানে মুসলমান পটুয়াদের তুলিতে মূর্ত হয়ে ওঠেন হিন্দু দেব-দেবীরা- তিয়াসা গুপ্তা ( প্রবন্ধ) , inscript.me
৪.পটুয়া সঙ্গীত- শ্রী গুরুসদয় দত্ত
৫.বাংলার লোক সংস্কৃতি- ওয়াকিল আহমেদ,পৃ: ৮০