28/05/2026
আন্দামানের সেলুলার জেলে বিনায়ক সাভারকার কে নিয়ে আসা হয় ৪ ঠা জুলাই, ১৯১১। নির্বাসনের কঠিন সাভারকারের পছন্দ হয়নি। তাই উল্লাসকর দত্তের মতো প্রতিবাদের পথ বেছে না নিয়ে সাভারকার বেছে নেন আপোষের পথ। বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে সাভারকার ভাইদের সঙ্গে জেলারদের ভালো সম্পর্ক ছিল। তাই তাঁরা বাকি কয়েদিদের সাথে আন্দোলনে যুক্ত হতে চাইতেন না। ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী যেটা জানতেন না তা হল কালাপানিতে আসার কয়েকমাসের মধ্যেই ইংরেজ সরকারের কাছে ক্ষমা চেয়ে সাভারকার তাঁর প্রথম চিঠিটি লিখে ফেলেছিলেন। ৩০ শে আগস্ট, ১৯১১ সালে লেখা এই চিঠি সেপ্টেম্বর মাসেই খারিজ হয়ে যায়। এই চিঠিতে তিনি লেখেন, প্রথমেই আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি আপনাদের সম্মান এতটাই ভালো যে আমি ক্ষমাপ্রার্থনার জন্য আবেদন করতে পারছি এবং অনুমতি দেওয়া হয়েছে যে এই আবেদন পাঠানো হবে সরকারের কাছে।
এর পরের চিঠিটি ১৯১৩ সালে, স্যার রেজিনাল্ড ক্রাডকের উদ্দেশ্যে। সেখানে তিনি বলেন, আমাকে ছয় মাস একাকী নির্বাসনে কাটাতে হয়েছে। তারপর থেকে তো আমি যথাসম্ভব ভালো ব্যবহারের চেষ্টা করেছি। অন্য কয়েদিদের কারো দোষের জন্য আমার সাজা হওয়া উচিত নয়, সাজা হওয়া উচিত শুধুমাত্র আমার নিজের দোষের জন্য। কেউ না কেউ, কখনো না কখনো, কোনো নিয়ম তো ভাঙবেই। সেই নিয়মভঙ্গের জন্য যদি সবার সাজা হয়, তাহলে আমিই বা কেমন করে বাঁচি?
আমি সরকারের প্রয়োজনে যে কোনো দায়িত্ব পালন করতে রাজী আছি। কেবলমাত্র মহানের পক্ষেই দয়া করা সম্ভব। আর বিপথগামী সন্তান পিতৃসুলভ সরকারের কাছে ফিরে আসবে না তো কোথায় যাবে?
১৯১৪ ও ১৯১৮ সালে সাভারকার ক্ষমা চেয়ে আরও দুটো চিঠি লেখেন। ইম্পিরিয়াল কাউন্সিলের সদস্য স্যার উইলিয়াম ভিনসেন্ট বলেন যে প্রথম চিঠিটায় সাভারকার সরকার বাহাদুরকে জানান যে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইংরেজদের হয়ে লড়তেও রাজি আছেন, শুধু যদি তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর সাথে তিনি এও অনুরোধ করেন যে তাঁর সাথে বাকি সকল রাজনৈতিক বন্দীদেরও মুক্তি দেওয়া হোক।
১৯১৭ এর চিঠিতে আর অন্য কারোর কথা বলবার প্রয়োজন মনে হয়নি সাভারকারের। সেখানে তিনি কেবলই জানিয়েছেন যে মন্টেগু-চেমসফোর্ড রিফর্ম বিল পাশ হলে তাঁর পূর্ণ সমর্থন থাকবে। শুধু যদি তাকে দয়া করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এরপরে আসে ১৯২০ সালের চিঠি। সে এক আশ্চর্য দলিল। হীনতা, নির্লজ্জতার চরম উদাহরণ। বারীন ঘোষ সহ অন্যান্য সহযোদ্ধাদের নাম টেনে এনে সাভারকার নালিশ করছেন। কই, ওদের তো পোর্ট ব্লেয়ারের থাকাকালীন সময়েও অনেক ষড়যন্ত্রের কান্ডারি ভাবা হয়েছিল। কিন্তু আমি বা আমার দাদা, কেউ কি এরকম কিছু করেছি? আমরা তো লক্ষ্মীটি হয়ে ছিলাম। আর যারা ছাড়া পেয়েছে তাদের থেকে আমাদের জেলের ব্যবহার কোনোমতেই বেশি আপত্তিজনক নয়। বরং গত ছয় বছরে আমাদের দুজনের বিরুদ্ধে একটিও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ নেই। আমি আমার পুরোনো রাজনৈতিক জীবন পুরোপুরি ত্যাগ করেছি। নতুন জীবনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আদর্শ নাগরিক হয়ে থাকবো। আমি আন্তরিকভাবে বলছি আমি সংবিধানের পথ মেনেই চলবো। ভারতবর্ষ ও ব্রিটেনের মধ্যে ভালোবাসা, সম্মান ও সৌভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করবো। মন্টেগু সাহেবের ইস্তাহারে যে সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখা হয়েছে, সেই সাম্রাজ্যকে আমি হৃদয় থেকে সমর্থন করি। যদি সরকার বাহাদুর বলেন, তাহলে আমি ও আমার দাদা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবো না। এই মর্মে লিখিত মুচলেকা জমা দিতেও আমরা প্রস্তুত। এছাড়াও যদি সরকার চান যে আমরা কোনো শর্ত পালন করি, যেমন কোনো বিশেষ এলাকার বাইরে যাওয়া চলবে না, অথবা নির্দিষ্ট সময় অবধি পুলিশকে আমাদের গতিবিধি সম্পর্কে জানাতে হবে -- রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য যে কোনো যুক্তিসঙ্গত শর্ত পালন করতে আমরা প্রস্তুত।
এর পরেই ১৯২৪ সালে মুক্তি পান সাভারকার ভাইয়েরা। মুচলেকা দিতে হয়েছিল আর কোনোদিন রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করবেন না।
১৯২৬ সালে "ব্যারিস্টার সাভারকার' নামে সাভারকারের মহত্বপূর্ণ জীবনী নিয়ে 'চিত্রগুপ্ত' নামক এক লেখক একটি বই প্রকাশ করেন। এই 'চিত্রগুপ্ত' আর কেউ নয় সাভারকার নিজেই চিত্রগুপ্ত ছদ্মনামে নিজের প্রশংসা করে বই লিখেছিলেন।
সাভারকার 'হিন্দুত্ব'-এর প্রবক্তা হয়ে বাকি জীবন কাটিয়েছেন| ইংরেজের আনুগত্য নিয়ে কাটিয়েছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে নয়| কারাবাসের সময় সাভারকার লিখতে শুরু করেন তাঁর বই, 'এসেনশিয়ালস অব হিন্দুত্ব', যা প্রথমে প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালে, পরে ১৯২৮ সালে পুনর্মুদিত হয় 'হিন্দুত্ব': হু ইজ আ হিন্দু?' নামে। সাভারকারের হিন্দুত্বের আদর্শে কে বি হেডগেওয়ার প্রচন্ড উৎসাহিত হয়ে ভারতকে কী ভাবে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা যায়, তাই নিয়ে তাঁর সাথে দীর্ঘ আলোচনা করেন। কয়েকমাস পর ১৯২৫ সীলে সেপ্টেম্বর মাসে হেডগেওয়ার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা RSS প্রততিষ্ঠা করেন। ১৯৩৭ সালে সাভারকার হিন্দু মহাসভার সভাপতি নর্বাচিত হন।
হিন্দু মহাসভার কলকাতা অধিবেশনে বক্তৃতায় সাভারকার বলেন, দেশের সমস্ত কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় "অতি অবশ্যই যেন যুবকদের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য উৎসাহ যোগায়, যে কোনও ভাবে এবং সবরকম ভাবে।" ১৯৪০ সালে মাদুরায় এক জনসভায় সাভারকার হিন্দুদের কাছে আহ্বান জানায়, "যত বেশি সংখ্যায় সম্ভব, দলে দলে ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদান" করুন। এরই পাশাপাশি নেতাজী গঠন করেছেন আজাদ হিন্দ ফৌজ, গাঁন্ধীজি ডাক দিচ্ছেন 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ফলে যখন কংগ্রেসের সমস্ত প্রথম সারির নেতা কারারূদ্ধ, সেই সময়ে হিন্দু মহাসভা সাভারকারের নেতৃত্বে মুসলিম লিগের সাথে হাত মিলিয়ে সিন্ধ ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে সরকার গঠন করে। সিন্ধ বিধানসভা ১৯৪৩ সালে ভারতকে টুকরো করে পাকিস্তান সৃষ্টি করার কথা অনুমোদন করে, হিন্দু মহাসভার মন্ত্রীরা তখনও সাভারকারের আপ্তবাক্য অনুসরণ করে কোয়ালিশন সরকারের নিজ নিজ পদে চুপ করে বসেছিলেন।
এই ছিলেন সাভারকার। এমন একটা মানুষ বিজেপি আর এস এস র আদর্শ হবে তা বলাই বাহুল্য।
✍ শ্রমজীবী The Labour