29/08/2024
রীল বনাম রিয়েল (২য় পর্ব).... 🔴🌑🔴
খুন হয়েছিলেন সেদিন তাঁর ডাক্তার স্বামী। তিনি কিন্তু একদম কাঁদেননি। বরং চেয়েছিলেন ন্যায়বিচার। আইনি লড়াইয়ে নেমেছিলেন একা, পাশে পাননি প্রতিবেশী সাধারণ নাগরিক থেকে স্বামীর সহকর্মীদের। নিজেই দৌড়াদৌড়ি করেছেন আদালত থেকে মহাকরণ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রীর দরজায় দরজায়। তেরোবছর পর যখন শীর্ষ আদালতে মামলা খারিজ হয়ে যায়, আফশোস করে বলেছিলেন ওই গৃহবধু, 'শুনেছিলাম এদের হাত অনেক লম্বা। তাও সাহস করে এক অসম লড়াইয়ে নেমেছিলাম! যা হবার তাই হয়েছে।' আর সিনেমার সাথে বাস্তবের ফারাকটা ঠিক এখানেই!
"কানুন কি হাত বহুত লম্বি হোতি হ্যায় !" হিন্দি সিনেমার এক পরিচিত সংলাপ। সত্যিই কি তাই, নাকি এদেশে নেতা মন্ত্রী রাজনীতির কারবারিদের হাত তার থেকেও লম্বা ? আসুন দেখে নেই......🏀
২০০৩ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি, মাঝরাতে ঝনঝন করে বেজে উঠলো রানাঘাট থানার ফোন। ঘুমচোখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে রিসিভার ওঠালেন ডিউটি অফিসার। ওপ্রান্ত থেকে যার গলা পেলেন তিনি এলাকায় সাড়া জাগানো নাম। মিনিট দুয়েক কথা বলে ফোন নামিয়ে রাখলেন ASI ভদ্রলোক, আর তারপরেই প্যান্টের বেল্ট কষতে কষতে ছুটলেন বড়বাবুর কোয়ার্টারের দিকে ।
অনেক রাতে সেদিন নোকারি এলাকার এক পুকুরে ভাসতে দেখা গিয়েছিল রানাঘাট মহকুমা হাসপাতালের সার্জেন ডাক্তার চন্দন সেনের নিথর দেহ। হাসপাতালের এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মীর বাড়িতে খানাপিনার নিমন্ত্রণ ছিল তাঁর। আর ফেরেননি। ওই বাড়ির পাশেই পুকুরে মেলে তাঁর দেহ। সকাল হবার আগেই পুকুর থেকে পুলিশ উঠিয়ে আনলো ডাক্তার সেনের লাশ।♦️
রানাঘাটে ডাক্তার সেন একাই থাকতেন। বৃদ্ধা মা আর দশ বছরের ছেলেকে নিয়ে বাগুইআটিতে থাকতেন তাঁর স্ত্রী বিদিশা। রানাঘাটে আসতেন মাঝে-সাঝে। চন্দন সপ্তাহান্তে কলকাতায় আসা-যাওয়া করতেন। যে দিন থেকে আর গেলেন না, সে দিন থেকে পাল্টে গেল সব কিছু। শুরু হল লড়াই। যারা সন্দেহের তালিকায়, তাদের প্রায় সকলেই কোনও না কোনও ভাবে রানাঘাট হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত। সেখানেই তড়িঘড়ি ডাক্তারের দেহের ময়নাতদন্ত সেরে ফেলারও চেষ্টা হয়। কিন্তু তাঁর পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চাপে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে দেহ নিয়ে গিয়ে ময়নাতদন্ত করানো হয়। তখনই পরিষ্কার হয়ে যায় যে,ডাক্তার সেনকে খুন করা হয়েছে। কিন্তু কেন ?
পুলিশের তদন্ত বলল, সৎ এবং আদ্যন্ত হাসপাতাল-দরদি চন্দন সেন একটা কায়েমি চক্রের মুনাফার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন। তাই তাঁকে নিমন্ত্রণ করে ডেকে নিয়ে গিয়ে পরিকল্পিত ভাবে খুন করা হয়। এই খুনে জড়িত সন্দেহে রানাঘাট হাসপাতালের তিন চিকিৎসক— শুভরঞ্জন খাঁড়া, তাঁর স্ত্রী অরুন্ধতী খাঁড়া ও রহমত আলমকে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়া আলমের গাড়িচালক আব্বাস আলি কারিগর, রানাঘাট হাসপাতালের সমাজকল্যাণ আধিকারিক অপূর্ব সান্যাল গ্রেফতার হন এবং যাঁর বাড়িতে ভোজসভা বসেছিল, সেই অবসরপ্রাপ্ত কর্মী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁর ছেলে গৌতমকেও পাকড়াও করে পুলিশ।
কৃষ্ণনগর আদালতে মামলা শুরু হয়। বিদিশার তত দিনে আরও একটা লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে। সেটা হল, বৃদ্ধা শাশুড়ি আর নাবালক ছেলেকে সামলে বেঁচে থাকার লড়াই। চন্দনের মৃত্যুর মাত্র চার মাস আগে ক্যানসারে মারা গিয়েছেন তাঁর ভাই। বৃদ্ধা মা পুরোপুরি বিপর্যস্ত। ২০০৪ সালে রাজ্য সরকারের বদান্যতায় স্বাস্থ্য দফতরে চাকরি পান বিদিশা। নতুন কর্মক্ষেত্র কাজ শেখা, তারই মধ্যে সুবিচারের আশায় ছোটাছুটি। সিআইডি তদন্ত চেয়ে রাইটার্সে দৌড়াদৌড়ি। ভয়ে হোক বা লোভে, একের পর এক সাক্ষী যখন আদালতে গিয়ে ‘বিরূপ’ হয়ে যাচ্ছে, তখনও খুঁটি আগলে মামলা চালিয়ে যাওয়ার লড়াই।
শেষ পর্যন্ত সেই দিনটা আসে। ২০০৫ সালের ৫ই জুলাই কৃষ্ণনগর আদালত শুভরঞ্জন খাঁড়া, রহমত আলম, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং আব্বাস আলি কারিগরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। প্রমাণ লোপাটের দায়ে অপূর্ব সান্যালের পাঁচ বছর কারাদন্ড ঘোষণা করেন। তবে অরুন্ধতী খাঁড়া ও গৌতম প্রমাণাভাবে ছাড়া পান। বাগুইহাটির বাড়িতে বসে সেই রায় শুনে বিদিশা বলেছিলেন, লড়াই শেষ নয়, বরং শুরু। বলেছিলেন, ‘‘এর পরে হাইকোর্ট আছে। ওরা যাতে সেখানে গেলেও রেহাই না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।’’ সেই লড়াইটা কিন্তু তিনি হেরে গিয়েছেন। ২০১০ সালে কলকাতা হাইকোর্ট সকলকেই বেকসুর খালাস করে দেয়।
বিদিশা সে দিন আদালতে যাননি। অফিসে বসেই আইনজীবীর ফোনে খবর পান। খবরটা পেয়ে আরেকবার সর্বস্ব হারানোর উপলব্ধি হয়েছিল তার। এতোদিন ধরে যে কথাটা বহুবার শুনে আসছিলেন, সেটাই এবার সত্যি হয়ে দেখা দিলো। যাদের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন তিনি তাদের হাত অনেক অনেক লম্বা, এমনকি আইনের থেকেও!🌎
তত দিনে সংবাদমাধ্যমের নজর সরে গিয়েছে। ‘বন্ধু’রা বেশির ভাগই সরে গিয়েছেন পাশ থেকে। বিদিশার কথায় ‘‘কিন্তু আমি আর পারলাম না। দিল্লিতে গিয়ে আইনি লড়াই করার সামর্থ্য আমার ছিল না। থাকা-খাওয়ার জায়গা নেই। যাতায়াতের টাকা নেই। তার পর আর সরকার থেকে আমায় কিছু জানায়নি। তবে এক পরিচিত আইনজীবীর মাধ্যমে জেনেছি, মামলাটা ‘ডিসমিস’ হয়ে গিয়েছে।’’ তার পরেই তাঁর প্রশ্ন, ‘‘ওরা যদি খুন না করে থাকে তাহলে কে খুন করল?’’ জবাব দেবার জন্য আজ আর কেউ নেই!
সময়ের সাথে সাথে সবই এখন ধূসর স্মৃতি।রানাঘাটের সাধারণ মানুষের মন থেকে প্রায় মুছে গিয়েছেন ডাক্তার চন্দন সেন। সেই পানাপুকুরটা অবশ্য আজও আছে, যার মধ্যে লুকিয়ে এক সৎ ও জনদরদী চিকিৎসকের মৃত্যু রহস্য। 🔴
🌲 কলমে ✍🏻 স্বপন সেন 🌲