01/08/2026
চরিত্রবান মানুষই শক্তিশালী জাতির ভিত্তি: গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ে সুনীল আম্বেকরজী ।
গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাগৃহে আজ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর অখিল ভারতীয় প্রচার প্রমুখ শ্রী সুনীল আম্বেকরজীর উপস্থিতিতে এক বৃহৎ যুবক-যুবতী সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সম্মেলনে ছাত্র-যুবসমাজ, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তিনি সংঘের শতবর্ষ, ভারতের সাংস্কৃতিক ঐক্য, চরিত্রগঠন এবং আত্মনির্ভর সমাজ নির্মাণ নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন।
নিজের বক্তব্যে সুনীলজী বলেন, গত ২৫ বছরে ভারতের প্রতি দেশের মানুষের আস্থা ও আত্মবিশ্বাস উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আজ দেশের সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে ভারত বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সক্ষম। এই আত্মবিশ্বাসই নতুন ভারতের অগ্রযাত্রার অন্যতম ভিত্তি।
সংঘের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ড. কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার একশো বছর আগে এমন একটি সংগঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল চরিত্রবান, সংগঠিত ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলা। তিনি প্রথম সরসংঘচালকের জীবনাদর্শ ও সুদূরপ্রসারী চিন্তার বিভিন্ন দিকও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষের মধ্যে নিজের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও দেশের প্রতি গর্ব, স্বাভিমান এবং ‘স্ব’-এর চেতনা জাগ্রত হয়। তাঁর মতে, ভারতের প্রকৃত শক্তি তার সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং বহুত্বের মধ্যকার একাত্মতায় নিহিত।
সংঘের অন্যতম লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, হিন্দু সমাজকে হীনমন্যতা থেকে মুক্ত করা এবং সামাজিক বিভাজন দূর করাই সংঘের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিবর্তে সামাজিক পরিবর্তনের পথেই স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষায়, “ভালো মানুষদের সংগঠিত করাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। তাই সংঘের কাজ ধীরগতির মনে হলেও তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী।”
সংঘের ইতিহাস প্রসঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারণে সংঘ নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেও প্রতিবারই স্বয়ংসেবকদের আত্মনিবেদন এবং সমাজের আস্থার ফলে সংঘ আরও শক্তিশালী হয়ে সমাজের সামনে ফিরে এসেছে।
জাতপাত ও সামাজিক বিভাজনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংঘের শাখায় জাতি, বর্ণ বা সামাজিক অবস্থানের কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাই সমানভাবে জাতীয় চরিত্রগঠনের লক্ষ্যে একত্রিত হন। একইসঙ্গে তিনি ভারতের ভাষাগত, আঞ্চলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে দেশের অন্যতম শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
হিন্দুত্বের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, হিন্দুত্ব কোনো সংকীর্ণ ধারণা নয়; এটি এমন একটি জীবনদর্শন, যা বৈচিত্র্যের মধ্যে সহাবস্থান, পারস্পরিক সম্মান এবং সমন্বয়ের শিক্ষা দেয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, “যেমন ট্রাফিক নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, তেমনি ভারতীয় সাংস্কৃতিক দর্শনও সকলের সহাবস্থানকে সমানভাবে স্বীকৃতি দেয়।”
তিনি আরও বলেন, বিদেশে এখনও ভারত, হিন্দুত্ব এবং সংঘ সম্পর্কে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। সংঘ নতুন কোনো সংস্কৃতি বা প্রতীক তৈরি করেনি; বরং ভারতের চিরন্তন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠিত করার কাজ করে চলেছে।
পারিবারিক মূল্যবোধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, পাশ্চাত্যের তুলনায় ভারতে যৌথ পরিবার ও পারিবারিক সম্পর্ক প্রজন্মের মধ্যে দৃঢ় সংযোগ সৃষ্টি করে, যা ভারতীয় সমাজের অন্যতম শক্তি।
সমাজগঠনে আত্মনির্ভরতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, সংঘ এমন একটি সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখে, যেখানে মানুষ একে অপরের সহযোগিতায় স্বনির্ভর সমাজ গড়ে তুলবে। সমাজে সমস্যা থাকবেই, তাই প্রতিটি মানুষের উচিত নিজ উদ্যোগে সমাজের পাশে দাঁড়ানো।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের সামাজিক কাজের ফলেই আজ যোগ, ভারতীয় সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিচয় ও ঐতিহ্য নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা সমাজে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি তিনি সংঘের ঘোষিত ‘পঞ্চ পরিবর্তন’ কর্মসূচির গুরুত্বও তুলে ধরেন।
বক্তৃতার শেষাংশে তিনি বলেন, “স্বার্থের ভিত্তিতে স্থায়ী ঐক্য গড়ে ওঠে না। প্রকৃত ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব চরিত্রবান মানুষের মাধ্যমে, যারা নিজের স্বভাব, অহংকার ও ব্যক্তিস্বার্থকে নিয়ন্ত্রণ করে সমাজ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন। ভারতীয় চিন্তাধারায় তাই চরিত্র নির্মাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।”
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে উপস্থিত যুবক-যুবতীরা বর্তমান সমাজ, জাতীয় জীবন এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। সুনীল আম্বেকরজী প্রতিটি প্রশ্নের বিস্তারিত ও গুরুত্বসহকারে উত্তর প্রদান করেন। প্রাণবন্ত এই প্রশ্নোত্তর পর্ব পুরো সম্মেলনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ ও অনুপ্রেরণামূলক করে তোলে।