29/08/2019
টাকি নিয়ে কিছু অযথা কথা। সবাই বলছে আমিও বলব, টাকি এখন অনেক সুন্দর, মূলত সভ্য। অজীর্ণ রোগে ভোগা সংস্কৃতি সাংস্কৃতিক আঁতেল আঁতেল ম্যাড়মেড়ে চেহারা পাল্টে রিতিমতো চেকনাই, কর্পোরেটীয় ফুরফুরে। এখন মানুষ ফূর্তিতে ডগমগ, কামাই হচ্ছে, পর্যটকের কাফিলা জুটছে, পণ পাওয়া জামাইয়ের মতো তাঁরা প্রশংসায় পাঁচটা মুখে জিভে সুরসুরিয়ে ঘোঁৎকারে টাকির ধ্বজা রাষ্ট্র করছে। ইতিপূর্বে টাকি নিয়ে গৌরবের কিছু ছিল না, যা লেখাটেখা আছে সব ঐতিহাসিক ঢপ, আতেলের ফক্কিরি। মোদ্দাকথা, টাকির এখন স্বর্ণযুগ। একথা বলছি -- ঠিক বলছি। শুধু নিজে বলে স্বস্তি পাচ্ছি না, কেউ সন্দেহ করলে তেড়ে যাচ্ছি, কামড়ে নেবার ঢঙে খ্যাঁক খ্যাঁক করে স্বীকার করাতে চাইছি - ঠিক করছি। সত্যের পক্ষে আমরা সত্যযুগীয় সৎ, রাম নাম সত্য করেও সৌন্দর্যবোধের সমৃদ্ধি ঘোষনায় আমরা অকাতর। গোটা টাকি বাদ - যাবতীয় ধ্যাষ্টামো এই নদীর ভেড়িতে এত নজরের কি আছে -- প্রশাসন আছে, তাঁরা নজরাণা কিছু কম পায়! এখন এখানেই যাবতীয় সৌন্দর্য সুললিত হয়েছে সিমেন্টে ইটে রডে রঙে - এটা অনেকের পছন্দ হচ্ছে না। ভেড়িতো মাটির ছিল, শীতে ধুলো, বর্ষায় এঁটেলের প্যাচপেচে কাদা - ছিঃ। পায়ে হাতে, চপ্পলের গুনে মাথাতক কুৎসিত লেপ্টালেপ্টি। ব্যাঙ ইঁদুরের সাথে চেনা অচেনা পোকার মতো ঘৃন্য প্রাণী, ভেড়ি আর ভাঙ্গা জমিদার বাড়ির আনাচে কানাচে নানা সাপ শেয়াল কাঠবিড়ালি ভামের উপদ্রব মেনে নেয় কোন সভ্য জগৎ? ভেঁড়ি ঘেঁষে নদীতে শুতে চাওয়া গোটা দুই নারকেল , কয়েকটা বিশ্রী খেজুর, শিশু, সারি সারি নিম, ক্যাওরাতলার দিকে অজস্র গাছের জটলা সন্ধের পরে ভীতু করে দিত শহরের বুক। মূল নদীখাত আর ভেড়ির সামান্য ফাঁকে অচেনা আগাছা উন্নতির বার্তা ছিলনা অন্তত। আজ স্তম্ভ নির্মাণের উল্লাসে সেসব বিড়ম্বনা ধ্বংস করেছি সমূলে। এখন সুউচ্চ ঝকঝকে সারিসারি হোটেলের বাহারি ঝিকিমিকি। আগে কদাকার কিছু গুলেমাছ পাড়ের কাদায় ঘুরেঘুরে খেলত রাতদিন, খোরখুল্লের ঝাঁক কুৎসিত ড্যাকরা চোখ ভাসিয়ে ডাঙ্গা ঘেষা জলে হামেশা বড্ড স্বাধীনতা ফলাত, শুশুকের (ডলফিন) দল বোকার মতো আকাশের দিকে ছুড়ে দিত জল। বড়রা বলত সেই জলে গা পচে যায়, ভয়ঙ্কর কামটে (ছোট হাঙর প্রজাতি) কুচ করে পা কেটে নেয় এখানে সাতরালে। এসব বিশ্রী আপদ এখন সম্পূর্ণ উৎখাত। সেসব ভয়ের কারন আমরা হত্যা করেছি কুশলতায়। জেলেদের জালে আমাদির সাথে তপসে বেলে গুলে পাঙাস ভোলা গলদা ভেটকি আর নানা নামে কুচো কুচো সব ম্যাড়মেড়ে ইতর মাছ ধরা হত। এখন সেসব নেই, আমাদি আছে, পটাস চিংড়ির সাথে চকচকে থার্মোকলের বাটি থালা আর নানারঙ বাহারি প্লাস্টিকে আলোকিত হয়ে ওঠে জাল - সে বড় নয়নাভিরাম। গোটা পাড় জুড়ে কংক্রিট কারু স্তম্ভে স্তম্ভিত আলো, ভেজা পরিদেহ ঘুরে ছনছন জল মুদ্রার মুদ্রায় যেন অলকানন্দা, আহা। হোটেলের সারি সারি ঘর, এসি, রঙ, কাঁচের চেকনাই। আগে হতটা কি? কোন প্রেমিক যুগল এধার ওধার নিভৃতি খুঁজে খুঁজে কোন এক গাছের গুড়ির আবছায়ায় গুঁড়ি মেরে অপচয় করত সময়। সন্ধের কাছাকাছি এক বা আধলা সামান্য চাঁদ হয়ত বাংলাদেশের মাটি ঘেঁষে তাঁদের চুপ করিয়ে রাখত কিছুক্ষণ। এখন ঘরে ঘরে নিভৃতির আয়োজন, ঘন্টায় ভাড়া নিলে টনটনে দোকাকি সময়। শুধু ওই বেদাদব চাঁদ আর ভোরের সূর্যটা কিছুতেই হোটেলের ঘর থেকে না ওঠার জেদে সুবৃহৎ দেওয়াল গুলোর আড়ালেই চাপা পড়ে বেশি -- বেশ হয়। দেখতে গেলে খরচা লাগে, সৌন্দর্য মাগনা নাকি! আর এই জমিদারি গিলে খাওয়া অহংকারী নদী --- সামান্য পরিসরে যেটুকু পলি লেনদেন করত, সব আমরা বন্ধ করেছি কংক্রীটে। নিজের পলিতে নিজেই ব্যাটা ভয়ানক থকথকে, গাঢ় আর ঘোলা জলে চকচকে রঙীন সব প্লাস্টিক বোতল ব্যাগের টোপর মাথায় দুলদুল করে এপার ওপার জোড়া বিশাল চরা নিয়ে কন্ঠাশ্বাস। মরে যাচ্ছে - বেশ হচ্ছে। এতবড় নদি জুড়ে বিপুল জায়গির পড়ে আছে। বুকের উপরে উঠেছে সামান্য দু একটা হোটেল। মরে গেলে আরো ভালো। আরো হোটেল, গায়ে গায় বিঘতে বিঘতে টাকা পুতে দিলে, টাকা হবে। আরো পর্যটক আসবে, তাঁরা থাকার জায়গা পাবে, শোওয়ারও। আমরা সঙ্গী সঙ্গীনি সার্ভ করব, ব্যবসা হবে -- ব্যওসা সতত সুন্দর। ওইতো পৃথিবীর ফুসফুস বলা অ্যমাজন পুড়ছে -- বেশ হচ্ছে। এরপর ওখানে খনি খনি হবে, বিশ্বের তাবড় আর্কিটেক্ট পৌছে খনিমুখে সোনা দিয়ে, সিমেন্ট দিয়ে স্বর্গীয় তোরণ বানাবে। দু একটা গাছের ভাস্কর্য সেই সাথে গড়ে নেবে যেগুলো কার্বন শোষণ করে ভরপুর অক্সিজেন বিলোবে মানব জাতিকে । এখানেও কিছু গাছ আর নদীর মর্মর মূর্তি বানাব।
শুধু যারা অসভ্য প্রায়, প্রকাশ্য অতীত প্রেয়সী, যারা মনে করে সমস্ত প্রাণীর বাঁচার অধিকার আছে, জ্যান্ত গাছ নদী একান্ত জরুরী -- তারা, সেইসব অবিবেচকরা জড় বৃক্ষের অক্সিজেন পাবে না। এরা লোকের রমরমা দেখতে পারেনা বলে পরিবেশের ফিকির তোলে, এমন সুন্দরতম কংক্রীটের বিরুদ্ধে কথা বলে। এরা বড্ড কুচুটে, এদের চোখে সর্বদা পিঁচুটি। আরে, প্রকাশ্য জনসভায় টাকির অভিভাবক ঘোষিত হয়েছেন, তাঁকে পিতা মানুন, তাঁর চোখ দিয়ে সৌন্দর্য দর্শনে আমরা লারেলাপ্পা, অযথা খাপ্পা না করলে কোথাও কিচাইন হবে না। বুঝে চলুন, সমঝে চলুন, কংক্রীটকে সুন্দর বলা মুখস্থ করে ভদ্রলোক হয়ে উঠুন।
--------- Collected 🙏🙏🙏🙏🙏