07/09/2026
বিগত সরকারের আমলে রাজ্যজুড়ে মেডিকেল কলেজগুলি সহ সমস্ত শিক্ষাঙ্গনে শাসকদলের ছাত্রসংগঠনের অনৈতিক কাজকর্ম, থ্রেট কালচার, নারী নির্যাতনের যে বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল তার বিরুদ্ধ-মনন বিজেপির ক্ষমতায় আসার পিছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে প্রথম দিন থেকেই আদর্শ দিয়ে তারা ছাত্রদের মন জয় করার বদলে গায়ের জোরে শিক্ষাঙ্গন দখল করার হীন প্রচেষ্টা শুরু করেছে। ফলে বারবার ছাত্রদের রক্ত ঝরছে শিক্ষাঙ্গনের পবিত্র মাটিতে; কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ থেকে শুরু করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ, মেখলিগঞ্জ সহ রাজ্যের সর্বত্র। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ছাত্রস্বার্থে আপোষহীন লড়াই এর ধারাবাহিক শক্তি AIDSO-র কর্মী সমর্থকরা।
তবে গত ২-৩ সেপ্টেম্বর উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে যে লাগাতার আক্রমণ চলল তা সকলকে হতবাক করে দিয়েছে। বহিরাগত ABVP নেতারা একটি মেডিকেল কলেজের এডমিশনের হল, যেখানে কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদেরও প্রবেশের অনুমতি দেয়নি, সেখানে ঢুকে AIDSO কর্মী সমর্থক ছাত্র-ছাত্রী ও জুনিয়র ডাক্তারদের বেধড়ক মারধর করেছে, নেতাজির ছবি কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে, ছাত্রীদের শারীরিক আক্রমণ করেছে, তিনজন ছাত্রের মোবাইল ছিনিয়ে নিয়েছে! ক্যাম্পাসের মধ্যে পুলিশ ফাঁড়ির সামনে দুজন প্রাক্তন ছাত্রকে যখন মারধর করছে পুলিশ নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এটা কোন রাজনীতি নাকি রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়াদের ক্ষমতার আস্ফালন; রাজ্যবাসী ভেবে দেখবেন। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে; কলেজ কর্তৃপক্ষ কেন বহিরাগত দুষ্কৃতিদের মেডিকেল কলেজের ভেতরে ঢুকে গুন্ডাবাজি করার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না, অভয়া আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা পুঁজি করে যারা ক্ষমতায় বসল তাদের শাসনে মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের নিরাপত্তা কোথায়? ABVP-র তোলা 'দেশবিরোধী' অপপ্রচার ও হুমকি অগ্রাহ্য করে AIDSO-র আদর্শবান ছাত্রছাত্রীরা পরদিন ৩ সেপ্টেম্বর যখন আবার নেতাজির ছবি নবাগত ছাত্রদের তুলে দিল এবং অভিভাবকরা তাদের স্নেহ দিয়ে অভিনন্দিত করল, দিশাহারা ও ক্ষিপ্ত BJP-ABVP দুষ্কৃতীরা কলেজের সামনে খাবার খাওয়ার সময় আবার নৃশংস আক্রমণ করল আমাদের কর্মীদের। মাথা ফেটে গুরুতর আহত হলেন রাজ্য সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য নর্থ বেঙ্গল ডেন্টাল কলেজের প্রাক্তনী ডাঃ অপূর্ব মন্ডল এবং প্রহৃত হলেন নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজের ডাঃ রামচন্দ্র শর্মা, ডাঃ সুশ্রী সঙ্গীতা জেনা সহ ছাত্র-ছাত্রী-ডাক্তার'রা। ছাত্রীদের কুৎসিত ইঙ্গিত, শ্লীলতাহানির হুমকি দেওয়া হল পুলিশের সামনে। এ আমরা কোন রাজ্যে বাস করছি? ঘুরেফিরে আসছে অভয়া আন্দোলনে উঠা প্রশ্নটিই; একটা মেডিকেল কলেজে যদি ছাত্র-ছাত্রী ডাক্তাররা নিরাপদ না হন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? এর নামই কি তবে 'ভয় আউট ভরসা ইন'?
আসলে বিজেপি-আরএসএস যে বিভেদ-বৈষম্য ও মিথ্যাচারের রাজনীতির আমদানি করছে তাই দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের যুক্তিবাদী, মেধাবী ও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন ছাত্র-ছাত্রীদের মন যে জয় করা যায় না, সেটা বুঝে গেছে। এই রাজ্য নবজাগরণের মনীষী রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুলদের তৈরি করা জমি, এই রাজ্য ইংরেজ শাসনের উৎপীড়ন থেকে আজাদীর জন্য আপোষহীন লড়াইয়ের জমি; ক্ষুদিরাম, দেশবন্ধু, মাস্টারদা, প্রীতিলতা, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর তৈরি করা জমি। আজাদী আন্দোলনের বিরোধিতা করে ইংরেজদের দালালি করা হিন্দু মহাসভা-জনসংঘের উত্তরসূরি বিজেপি তাকে ভয় পাবে বৈকি! তাই যে নেতাজি ধর্মকে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ বাদ দিতে বলেছিলেন, তাঁর ছবি ছাত্রদের হাতে দেখলে ভয় পায়, ছুঁড়ে ফেলে দেয়। খোদ মুখ্যমন্ত্রী লাগাতার হুমকি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে যুক্তিবাদী মেধাবী কলেজ পড়ুয়াদের 'দেশ বিরোধী' তকমা এঁটে ক্রমাগত 'হেট স্পিচ' দিচ্ছেন। শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্রের চর্চা তো দূর অস্ত, গণতন্ত্রের চিহ্নটুকু পর্যন্ত মুছে ফেলতে প্রশাসন এবং পুলিশকে ন্যাক্কারজনক ভাবে কাজে লাগাতে এরা দ্বিধা করে না।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এতটা নির্বোধ নয়। বহিরাগত গুন্ডাদের নিয়ে এসে গায়ের জোর দিয়ে, বিভেদ বৈষম্যের বিষ ছড়িয়ে কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করে শাসন ক্ষমতা দখল করা যায়, ছাত্র-ছাত্রীদের মন জয় করা যায় না। তার প্রমাণ আজ গোটা ভারতবর্ষে। গোটা দেশের ছাত্র-ছাত্রী যুবসমাজ আজ বিজেপি-আরএসএস এর ভন্ডামি মিথ্যাচার এবং চূড়ান্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে পথে নেমেছে। দিল্লিতে জেন-জি আন্দোলন বাধ্য করেছে তাদের উদ্ধত মাথা মাটিতে নামাতে, তারই ধারাবাহিকতায় বিহার ঝাড়খন্ড কলকাতায় হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী পথে নেমেছে; তারা বিভেদ বৈষম্য ভ্রষ্টাচারের বিরুদ্ধে পুলিশের লাঠি জলকামান কোন কিছুর পরোয়া করেনা। গত ১ লা সেপ্টেম্বর সেই ছাত্রদেরই একাংশ কলকাতায় রাজপথ লাল পতাকায় স্লোগানে মুখরিত করে তুলেছে। এসব দেখে শাসক বিজেপি-আরএসএস এবং তাদের শাখা সংগঠনগুলি আজ দিশাহারা। তারা মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সন্ত্রস্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাতে যে কাজ হবে না তার প্রমাণ এত আক্রমণের পরেও, কর্তৃপক্ষ পুলিশের এরকম ন্যাক্কারজনক নিষ্ক্রিয়তা সত্ত্বেও নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী জুনিয়র ডাক্তাররা হার মানেনি। মাথা উঁচু করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে যাদবপুর সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের কলেজগুলিতে মুক্তমনা ছাত্রছাত্রীরা। ABVP-BJP র ফ্যাসিস্ট আক্রমণের বিরুদ্ধে সমস্ত ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে।
আমরা এই রাজ্যের আপোষহীন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন AIDSO, আমরা মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষায় ধারাবাহিকভাবে ভারতবর্ষের নবজাগরণ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের মনীষীদের জীবন চর্চার করে এসেছি, এটা আপনারা দেখেছেন। তাঁদের অপুরিত স্বপ্ন পূরণ করতে আমরা বদ্ধপরিকর। তাই আপনারা অনেকে এই আক্রান্ত ছাত্রছাত্রীদের দেখেছেন বিভিন্ন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই-আন্দোলনে, দেখেছেন বন্যার্ত মানুষের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ করতে, দুর্গত এলাকায় ছুটে গিয়ে মেডিকেল ক্যাম্প করতে, আবার দেখেছেন বিভিন্ন মনীষীদের জীবনচর্চা করতে। আপনারা অনেকেই ভালোবেসে আমাদের এই কাজকর্ম সঙ্গে থেকেছেন। বিগত কয়েক দশক ধরে শুধু এই রাজ্য নয় সারা দেশে ছাত্র-স্বার্থে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি; জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০, স্কুল শিক্ষা ধ্বংস করার প্রচেষ্টা, চার বছরের অবৈজ্ঞানিক ডিগ্রী কোর্স, মেডিকেল শিক্ষার অবনমন, অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেয়ার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই লাগাতার জারি আছে। শিক্ষকের অভাবে ধুঁকতে থাকা স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া রুখতে আমাদের লড়াই চলছে। কলেজগুলিতে গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আমাদের লড়াই চলছে। এই লড়াইয়ের পথে প্রতিটি সরকারই তীব্র আক্রমণ নামিয়ে এনেছে, অত্যাচার করেছে। কিন্তু আন্দোলন তারা দমন করতে পারেনি। আমরা প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি পুনঃপ্রবর্তন, মেডিকেল শিক্ষায় ক্যাপিটেশন ফি বাতিল করা, এমবিবিএস ছাত্রদের অবৈজ্ঞানিক NEXT পরীক্ষা বাতিল করা সহ বহু বিজয়ী আন্দোলনের সাক্ষী। বিপরীতে আক্রমণ নামিয়ে আনা শাসকদলগুলি নিজেরাই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অতি সম্প্রতিকালে গত ১৪ আগস্ট ২০২৪ আরজিকর মেডিকেল কলেজে বহিরাগত দিয়ে ব্যাপক আক্রমণ-সন্ত্রাস করে যারা আন্দোলন দমন করতে চেয়েছিল, তাদের পরিণতি থেকে যদি কেউ শিক্ষা না নেয়, একই পরিণতির দিকে তাদের দ্রুত অগ্রগতি ঠেকাবে সাধ্য কার?
তাই পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত অভিভাবক ও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের কাছে আমাদের আবেদন, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাঙ্গন গুলিতে গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে, শিক্ষার প্রাণসত্তা রক্ষার স্বার্থে আপনারাও সোচ্চার হোন। বহিরাগত দুষ্কৃতিদের দ্বারা শিক্ষাঙ্গনে যে সন্ত্রাস নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলছে, যেভাবে আক্রমণকারীদের প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে তা রুখতে না পারলে রাজ্যের অবশিষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থাটুকুরও অন্তর্জলী যাত্রা সম্পূর্ণ হবে। ভবিষ্যৎ আমাদের ক্ষমা করবে না। সর্বোপরী সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে আমাদের অনুরোধ, আজ আর ভয় পেয়ে চুপ করে থাকার দিন নেই, সময় এসেছে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার। আসুন, ক্যাম্পাসের গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে আজ এই বিভেদ সৃষ্টিকারী, মিথ্যাচারী ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যাপক ছাত্র-ঐক্য গড়ে তুলে লড়াইয়ে সামিল হই। সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী।
সংগ্রামী অভিনন্দন সহ
মণিশংকর পট্টনায়ক
সভাপতি
বিশ্বজিৎ রায়
সম্পাদক
AIDSO পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি